সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে কিছু বিষয় খুব চোখে পড়ছে। কেউ গোপনে নানা ধরনের গার্লস গ্রুপ পরিচালনা করছে, সেখান থেকে সম্পর্কের মাধ্যমে বা সমঝোতার মাধ্যমে বিশেষ সময় আদান-প্রদান হচ্ছে। আবার কেউ নিজ স্বাচ্ছন্দের জন্য পারিবারিক সীমার বাইরে গিয়ে বাড়তি সম্পর্কে জড়াচ্ছে, বিশেষ দিন বা সময় কাটানোর জন্য বিদেশ ভ্রমণেও যাচ্ছে। এসব দেখলে মনে হয়, মানুষ নিজের চাহিদা ও ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
দেখা যায়, যে নারী গোপন গ্রুপ চালাচ্ছেন তিনিও স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। আবার যে পুরুষ পরিবারের বাইরে সম্পর্কে জড়াচ্ছেন, তিনিও স্ত্রীর বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। অর্থাৎ প্রত্যেকে নিজের কাজকে ন্যায্য ভাবলেও, অন্যের ক্ষেত্রে তা মেনে নিতে পারছেন না। যদি নিজের ইচ্ছা বা নিজস্ব চাহিদার কারণেই এসব হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন, এত অভিযোগ কেন? একে অপরকে দোষারোপ কেন? এমনকি চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনাইবা কেন ঘটছে?
বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই এমন কিছু ঘটনার কথা শুনি, যা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। কোথাও দেখা যায় কিছু গোষ্ঠী বা সংগঠনের আড়ালে তরুণীদের বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে এসব কর্মকাণ্ডে অর্থ, প্রভাব বা সামাজিক সুবিধা লাভের প্রলোভন বড় ভূমিকা রাখছে। যদিও অনেকেই স্বেচ্ছায় এতে জড়িয়ে পড়ে বলে দাবি করা হয়, তবুও প্রশ্ন থেকেই যায় এই পরিস্থিতির পেছনে সামাজিক বাস্তবতা কতটা দায়ী?
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট। বিবাহের বাইরে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা ব্যক্তিগত আনন্দ ও স্বাধীনতার নামে নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আধুনিক জীবনযাত্রা মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের ভারসাম্য রক্ষা করা সবসময় সহজ হয়ে উঠছে না।
তবে এই বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে পুরো চিত্রটি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে, সেগুলোর পেছনে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মতো নানা জটিল কারণ রয়েছে। অনেক তরুণ-তরুণী দ্রুত আর্থিক স্বচ্ছলতা বা সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা ঝাপসা করে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে যদি অনেক কিছুই মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল হয়, তাহলে সমাজে এত অভিযোগ, লুকোচুরি কিংবা মানসিক ভেঙে পড়ার ঘটনা কেন ঘটছে? এর একটি বড় কারণ হতে পারে সামাজিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্ব। অনেকেই এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন যা হয়তো সাময়িকভাবে লাভজনক বা আকর্ষণীয় মনে হয়, কিন্তু পরে সামাজিক চাপ, পারিবারিক প্রতিক্রিয়া বা ব্যক্তিগত অনুশোচনার কারণে মানসিক সংকটে পড়ে যান।
এই মানসিক সংকট অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিণতিও ডেকে আনে। সংবাদমাধ্যমে আমরা প্রায়ই আত্মহত্যার খবর দেখি, যা শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি সমাজের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিফলন। যখন মানুষ মনে করে তার সমস্যার কথা বলার মতো নিরাপদ জায়গা নেই, কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে গেছে, তখন সে হতাশার অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তোলে সমাজে বিশ্বাসের সংকট। অনেকেই মনে করেন এখন সত্যিকারে সৎ ও নির্ভেজাল মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। এই ধারণা পুরোপুরি সত্য না হলেও, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। যখন সমাজে অবিশ্বাস বাড়ে, তখন মানুষ একে অপরের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে এই পরিস্থিতিকে শুধু হতাশার চোখে দেখলে চলবে না। ইতিহাস সাক্ষী যে সমাজ নানা সংকটের মধ্য দিয়েই নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। নৈতিকতা কোনো স্থির ধারণা নয়; এটি সময়, শিক্ষা এবং সামাজিক চর্চার মাধ্যমে বিকশিত হয়। তাই সমাধানের পথ খুঁজতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র সবারই সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
প্রথমত, পরিবারকে আবারও মূল্যবোধ গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের সততা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ শেখানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে শুধু পেশাগত সাফল্যের জন্য নয়, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতিবাচক উদাহরণ তুলে ধরা, সচেতনতা তৈরি করা এবং সমাজে নৈতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পাশাপাশি আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কোনো অনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সহজে বিস্তার লাভ করতে না পারে।
সবশেষে এটুকুই বলবো, সমাজের নৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। তবে এই সংকটই আমাদের নতুনভাবে ভাবতে, মূল্যবোধকে পুনর্মূল্যায়ন করতে এবং একটি সুস্থ সমাজ গড়ার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। পরিবর্তনের এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা, মানবিকতা এবং নৈতিক সাহসকে আবারও জাগিয়ে তোলা।
লেখক: প্রদীপ্ত মোবারক
জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর