কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ আপেল মাহমুদ নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে এবার সাংবাদিক শাহেদ ফেরদৌস হিরুর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগ আড়াল করতেই এ জিডি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা। এ ঘটনায় জেলায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, কক্সবাজারের দৈনিক সকালের কক্সবাজার নামের একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কটেজ জোনের পতিতালয়, অবৈধ স্পা, সরকারি স্থাপনা বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া এবং পর্যটন নিরাপত্তা অবকাঠামো ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করার অভিযোগ তোলা হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে আপেল মাহমুদের নেতৃত্বেই এসব কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার, অভিযোগ কেন্দ্র, পুলিশ বক্স ও সরকারি জেট স্কি অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, লাবণী পুলিশ ফাঁড়ির সামনে স্থাপিত একটি ওয়াচ টাওয়ার রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করে অগ্রিম ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি আলোচনায় এলে সেটি ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যান্টিন নামে পরিচালনা করা শুরু হয়।
এছাড়া সুগন্ধা পয়েন্টে শহীদ কনস্টেবল পারভেজের নামে স্থাপিত তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্রও পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে লকার হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে কলাতলীতে স্থাপিত ট্যুরিস্ট পুলিশ হেল্প ডেস্ক বক্স দোকান ও লকার হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
লাবণী বীচ থেকে কলাতলী পর্যন্ত একটি রড কোম্পানির বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ২০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কটেজ জোনে থাকা সাতটি পতিতালয় থেকে মাসিক ভিত্তিতে মাসোহারা আদায় এবং শহরের বিভিন্ন হোটেলে পরিচালিত অর্ধশতাধিক অবৈধ স্পা থেকে দালালের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠে আসে।
সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ চারটি জেট স্কি ভাড়া দিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ। এছাড়া বীচ বাইক অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে এবং ইঞ্জিন বিক্রির মাধ্যমেও অনিয়ম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
সুগন্ধা পয়েন্টের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসনের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ প্রদান না করলে দোকান বসাতে দেওয়া হয় না। প্রভাবশালী এক স্থানীয় ব্যক্তির মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার সহযোগিতায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আপেল মাহমুদের বদলির আদেশ জারি হলেও পরবর্তীতে তা স্থগিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অতীতেও তাকে অন্য জেলায় বদলি করা হলেও তদবিরের মাধ্যমে পুনরায় কক্সবাজারে দায়িত্ব নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট পত্রিকার সাব-এডিটর শাহেদ ফেরদৌস হিরুর বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন আপেল মাহমুদ।
সাংবাদিক নেতাদের দাবি, অভিযোগ মিথ্যা হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তা না করে জিডির মাধ্যমে সাংবাদিককে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে।
এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কক্সবাজার ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি জসিম উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আজিম নিহাদ এক বিবৃতিতে দাবী করেন, দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে জিডি করে সত্য প্রকাশ বন্ধ করা যাবে না। তারা অবিলম্বে জিডি প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর