ঘুষ হিসেবে নেওয়া ২০ হাজার টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে পুলিশের মারধরের শিকার হওয়ার পর এক কলেজশিক্ষার্থী ও তার মাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় গত বুধবার (৪ মার্চ) বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম ওই সাজা দেন। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- পেকুয়া উপজেলার সাবেক গুলদি এলাকার মৃত নুরুল আবছারের স্ত্রী রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮) ও তার মেয়ে জুবাইদা জান্নাত (২৩)। জুবাইদা কক্সবাজারের চকরিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।
ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগ, জমিসংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিজেদের পক্ষে দিতে পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব তাদের কাছে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরে ভয়ভীতি ও নানা অজুহাতে ওই টাকা আদায় করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি তদন্ত প্রতিবেদন প্রতিপক্ষের পক্ষে জমা দেন।
পরিবারের দাবি, এ ঘটনায় বুধবার বিকেলে টাকা ফেরত চাইতে জুবাইদা তার মাকে নিয়ে পেকুয়া থানায় যান। এ সময় এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে মা-মেয়েকে মারধর করেন এবং থানার ভেতর আটকে রাখেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জুবাইদার প্রতিবেশী মনজিলা বেগম বলেন, আমি তাদের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলাম। জুবাইদা টাকা ফেরত চাইলে এসআই পল্লব তেড়ে যান। পরে পুলিশ সদস্যরা মা-মেয়েকে আটক করেন এবং আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।
স্বজনদের অভিযোগ, কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের ডাকে ইউএনও মাহবুব আলম থানায় আসেন। তখন ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুলে ধরলেও তা আমলে না নিয়ে উল্টো পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা-মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল বলেন, আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে মামলা চলছে। এসআই পল্লব দীর্ঘদিন ধরে হয়রানি করছিলেন। কিন্তু ন্যায়বিচার না পেয়ে উল্টো আমার মা ও বোনকে দোষী বানানো হয়েছে।
রেহেনা মোস্তফা রানুর বোন আমেনা মুন্নী বলেন, পরিকল্পিতভাবে আমার বোন ও ভাগনিকে ফাঁসানো হয়েছে। আমরা দ্রুত তাদের মুক্তি চাই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউএনও মাহবুব আলম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, থানায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগটি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। খারাপ আচরণের কারণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেন, মা-মেয়ে থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলা করেছেন। এ কারণে ইউএনও মহোদয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের সাজা দিয়েছেন। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবগত নই।
এ বিষয়ে জানতে এসআই পল্লবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
উল্লেখ্য, পেকুয়া উপজেলা বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নিজ এলাকা। ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আটক মা-মেয়ের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে আহত মা-মেয়ের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ছবিতে রেহেনা মোস্তফা রানুর চোখের নিচে ও মুখে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়। দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন ঘিরে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই ঘটনাটিকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারপ্রার্থীদের প্রতি নির্মম আচরণের উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন তারা।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর