ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে ঘিরে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করার অভিযোগ তুলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ড. খলিলুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও ফল প্রস্তুত ও ঘোষণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা হয়েছে। তার দাবি, সাবেক উপদেষ্টাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যেই সেই অভিযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
শুক্রবার ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগে এই দুই সাবেক উপদেষ্টার গ্রেফতারের দাবিতে কর্মসূচি পালন করে জামায়াত। এর আগেও বৃহস্পতিবার দলটির নায়েবে আমির তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তবে এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
সাক্ষাৎকার ঘিরে বিতর্ক
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিজওয়ানা হাসানের একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারীবিদ্বেষী ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিকে মূলধারায় আসতে দেওয়া হয়নি। এই বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ ও ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়।
রিজওয়ানা হাসানের ব্যাখ্যা
বৃহস্পতিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, তার বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাক্ষাৎকারে মূলত নারীদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী মনোভাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। উপস্থাপক তখন মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর নির্যাতন এবং নারীদের নিয়ে কটূক্তির প্রসঙ্গ তোলেন।
তিনি জানান, ওই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন—যারা এসব কটূক্তি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে নারীসমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছে। সরকারও বিষয়টি নিয়ে কথা বলায় অভিযুক্তরা ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে। তার মতে, এই ধরনের শক্তি যেন সমাজে প্রাধান্য না পায়, সে বিষয়ে নারীসমাজকে কাজ করতে হবে।
রিজওয়ানা হাসান আরও বলেন, তার বক্তব্যে নির্বাচন প্রসঙ্গই আসেনি। উপস্থাপক হঠাৎ নির্বাচনের কথা তুললে তিনি শুধু বলেন, বিরোধী দলের যে অংশ নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের সঙ্গে কাজ করা যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের নাম তিনি উল্লেখ করেননি এবং বিরোধী দল অবশ্যই মূলধারার অংশ।
তার মতে, ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে, যা অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
সাক্ষাৎকারে আরও যা বলেন
সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশজুড়ে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন মাজারে হামলা, বাউলদের ওপর নির্যাতন এবং নারীদের নিয়ে কটূক্তির মতো ঘটনাও ঘটেছে। ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি অত্যন্ত চাপপূর্ণ ছিল এবং বিশৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে এত তীব্র নারীবিদ্বেষী ভাষা আগে শোনেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে।
রিজওয়ানা হাসানের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নারীবাদের কোনো বিরোধ ছিল না। বরং নারীর অধিকার রক্ষায় সরকার দুটি নতুন আইন করেছে—একটি পারিবারিক ক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে এবং অন্যটি কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ঠেকাতে।
তার মতে, উগ্রবাদী শক্তি সমাজে আগে থেকেই ছিল এবং সুযোগ পেলেই তারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা কোনো নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারেনি। নারীর অধিকার ও সমান অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শক্তি যেন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে—এটাই ছিল তাদের লক্ষ্য।
এই বক্তব্য প্রচারের পর বুধবার এটি অনেকেরই মুখেমুখে ছিল। এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ লিখেছেন, আবার অনেকে এ বিষয়ে ভিডিও কনটেন্ট বানিয়েছেন। তাদের এসব কনটেন্ট এবং লেখার মূল বক্তব্য ছিল অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে জামায়াতে ইসলামীকে হারিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াত দাবি করেছে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন প্রভাবিত করে জামায়াতকে ‘মূলধারা’ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এ সময় তারা সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিযুক্ত করে। বলা হয়, ষড়যন্ত্র করে বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে সহায়তা করায় তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর