• ঢাকা
  • ঢাকা, রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৪৩ মিনিট পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৪ মার্চ, ২০২৬, ১০:৪১ রাত

ঈদ মার্কেটে নিম্নবিত্ত বাবাদের দীর্ঘশ্বাস, হিসেব মেলাতে হিমশিম

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজার শহরের একটি শপিং মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আব্দুস শুক্কুর। পেশায় ভ্যানচালক। সদরের পিএমখালী থেকে চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন ঈদের কেনাকাটা করতে। মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল দুই ছোট সন্তান।

দৃশ্যটি চোখে পড়তেই কথা হয় তার সঙ্গে। কথা বলতে গিয়ে কয়েকবার থেমে গেলেন তিনি। চোখেমুখে স্পষ্ট অসহায়ত্ব।

আব্দু শুক্কুর বললেন, সন্তানদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছি। আমার কাছে যে টাকা আছে, ভেবেছিলাম তা দিয়ে মুটামুটি সবার কাপড় হয়ে যাবে। কিন্তু এখানে এসে দেখি হিসেব মিলছে না।

তিনি জানালেন, অনেক দোকান ঘুরেও সন্তানের পছন্দের পোশাকের দাম শুনে হতাশ হয়ে পড়েছেন। ছোট বাচ্চা দুটির যে কাপড় পছন্দ হয়েছে, সেগুলোর দাম অনেক বেশি। কিনে দিতে পারছি না। তাই তারা কান্না করছে, বলতে বলতেই চোখ মুছলেন তিনি।

একটু দুরেই চোখে পড়লো আরেকটি দৃশ্য। সদরের খরুলিয়ার দিনমজুর মিয়া হোসেনের ঈদ এবার যেন আনন্দের চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি হয়ে উঠেছে। দুই প্রতিবন্ধী সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ঈদের কেনাকাটা যেন বাড়তি এক চাপ। শুক্রবার বিকেলে কক্সবাজার শহরের একটি মার্কেটের সামনে বসে ছিলেন তিনি। পাশে দুই সন্তান চুপচাপ তাকিয়ে ছিল দোকানের কাঁচে ঝোলানো রঙিন পোশাকগুলোর দিকে।

মিয়া হোসেন বলেন, সারাদিন দিনমজুরি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না। তবু ঈদ বলে কথা, সন্তানদের জন্য কিছু একটা কিনে দিতে শহরে এসেছি। কিন্তু দোকানে দোকানে ঘুরে দাম শুনে হতাশ হয়ে পড়েছি। বাচ্চাদের মনটা তো বোঝে না অভাব কী জিনিস। তাদের মুখের দিকে তাকালে খালি মনে হয়, যদি একটু ভালো করে ঈদের কাপড়চোপড় দিতে পারতাম।

এদিকে পরিবারের সঙ্গে কেনাকাটা করতে আসা শিশুদের আনন্দ আর অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার এই বৈপরীত্য যেন ঈদের বাজারে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। মার্কেটের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আব্দু শুক্কুরের বড় ছেলে তখন ছোট ভাই-বোনকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, কাঁদিস না, অন্য দোকান থেকে কিনে দেবে বাবা। কিন্তু ছোটরা ততক্ষণে দোকানের কাঁচের ভেতরে ঝুলানো রঙিন পোশাকের দিকে তাকিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে।

শুক্কুর বললেন, আমরা গরিব মানুষ। প্রতিদিন যা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তবু ঈদ বলে কথা। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা তো করতেই হয়।

তিনি আরও বলেন, আজ ভোরে ভ্যান চালিয়ে কিছু টাকা আয় করে তবেই পরিবারকে নিয়ে শহরে এসেছেন। ভাবছিলাম পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় সবার কিছু না কিছু হয়ে যাবে। এখন মনে হচ্ছে দুইজনের কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যাবে। তবু হতাশার মাঝেও সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করছেন এই বাবা।

মিয়া ও শুক্কুরের মতো এমন দৃশ্য এখন কক্সবাজার শহরের অনেক মার্কেটেই দেখা যাচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে জমে উঠেছে কেনাকাটা। তবে বাজারে ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ স্বল্পআয়ের মানুষ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাম জিজ্ঞেস করছেন, আবার অনেকেই চুপচাপ চলে যাচ্ছেন।

শহরের একটি পোশাকের দোকানে ঢুকে দেখা যায়, কয়েকটি শিশু নতুন পোশাক দেখে আনন্দে উচ্ছ্বসিত। কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা-মায়ের চোখে উদ্বেগ।

রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি থেকে আসা দিনমজুর মোহাম্মদ ইয়াছিন বললেন, বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকালে কিছু বলতেও পারি না। তারা তো বোঝে না টাকা কষ্ট করে আয় করতে হয়। একটা জামার দাম শুনে মনে হচ্ছে পুরো দুই দিনের আয় শেষ।

তিনি বলেন, আগে ঈদের সময় অন্তত দুই সেট কাপড় কিনে দিতেন সন্তানদের। কিন্তু এবার একটি সেট কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। শুধু পোশাক নয়, জুতা ও অন্যান্য সামগ্রীর দামও বেড়েছে বলে জানান ক্রেতারা।

কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, শিশুদের পোশাকের দাম শুরু হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকা থেকে। কিছু ক্ষেত্রে তা দুই থেকে তিন হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তদের জন্যও এই দাম চাপের হলেও স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য তা প্রায় নাগালের বাইরে।

শহরের একটি দোকানের বিক্রেতা তুষার বলেন, ক্রেতা অনেক আসছেন, কিন্তু বেশিরভাগই দাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই বলেন, বাজেটের মধ্যে কিছু দেখাতে। তিনি জানান, পাইকারি বাজারে পোশাকের দাম বাড়ায় খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে।

কক্সবাজারের ঈদের বাজারে ঘুরে দেখা যায়, এমন গল্প কেবল একজন শুক্কুরের নয়। অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারই এখন হিসেব-নিকেশ করে কেনাকাটা করছেন। কেউ কম দামের দোকান খুঁজছেন, কেউ আবার সন্তানের আবদার সামলাতে চেষ্টা করছেন।

এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মা সন্তানের হাত ধরে বলছিলেন, এইটা পরে কিনব, আগে অন্যটা দেখি। তার কণ্ঠে ছিল সান্ত্বনা, কিন্তু চোখে ছিল দুশ্চিন্তা।

ঈদের আনন্দ সবার জন্য সমান হলেও সেই আনন্দের পথে সবার যাত্রা সমান সহজ নয়। কারও কাছে ঈদের কেনাকাটা আনন্দের, আবার কারও কাছে তা হয়ে ওঠে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার এক দিন। কক্সবাজার শহরের ব্যস্ত মার্কেটের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আব্দু শুক্কুরের মতো অনেক বাবা-মা তখনও চেষ্টা করছেন সন্তানদের হাসি ধরে রাখতে। হিসেবের খাতায় সংখ্যা মিলছে না, তবু হৃদয়ের খাতায় সন্তানের আনন্দই যেন বড় হয়ে উঠছে।

নিন্মবিত্তদের মতে, ঈদ মানেই আনন্দ। নতুন পোশাক, পরিবার-পরিজনের হাসি, ছোটদের উচ্ছ্বাস- সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও অনেকের কপালে জমছে দুশ্চিন্তার রেখা। বাজারে পোশাকের বাড়তি দাম আর নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে ঈদের কেনাকাটা যেন স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে এক কঠিন হিসাবের খাতা।

অন্যদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে কক্সবাজার শহরের বিপণিবিতানগুলোতে জমে উঠেছে কেনাকাটা। দুপুর গড়াতেই মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করে, যা গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। অনেক মার্কেটেই রাত দুইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত চলছে বেচাকেনা। তবে উৎসবমুখর এই পরিবেশের মাঝেও আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে স্বল্প আয়ের অনেক মানুষ পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।

শুক্রবার রাত ও শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শহরের পানবাজার সড়ক, সালাম মার্কেট, নিউমার্কেট, সুপার মার্কেট, হকার্স মার্কেট, জিয়া কমপ্লেক্স ও লালদিঘীর পাড় এলাকার বিভিন্ন বিপণিবিতান ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি দোকানেই ক্রেতাদের ভিড়। বিশেষ করে পোশাকের দোকানগুলোতে নারী, পুরুষ ও শিশুদের নতুন পোশাক দেখছেন ক্রেতারা। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই দরদাম করছেন, আবার কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পছন্দের পোশাক বেছে নিচ্ছেন।

রাতে মার্কেটগুলোর ভেতরে রঙিন আলো, নতুন পোশাকের সারি এবং ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহলে পুরো পরিবেশ যেন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। শহরের বিভিন্ন ফুটপাতের দোকানেও দেখা গেছে ব্যাপক ভিড়। স্বল্প দামের পোশাক ও জুতার খোঁজে অনেকেই ভিড় করছেন এসব দোকানে।

শহরের বর্মিজ মার্কেটের পোশাক বিক্রেতা শওকত হোসেন বলেন, রমজানের প্রথম দিকে ক্রেতা তুলনামূলক কম ছিল। তবে ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাজার জমে উঠছে। এখন দুপুরের পর থেকে ক্রেতা বাড়তে থাকে। ইফতারের সময় একটু কম থাকলেও রাতের পর আবার ভিড় বাড়ে। অনেক সময় রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত কেনাকাটা চলে।

হকার্স মার্কেটের দোকানি লিটন বলেন, শিশু থেকে শুরু করে যুবকদের পোশাকের চাহিদা বেশি। অনেক পরিবার একসঙ্গে এসে সবার জন্য পোশাক কিনে নিচ্ছেন।

সুপার মার্কেটের দোকানি মাহিন উদ্দিন বলেন, ক্রেতার চাপ এখনো আছে। শুরুতে একটু বেশি ছিল। মহিলাদের থ্রি-পিসের চাহিদা বেশি থাকায় অনেকগুলো আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। এখন টেইলারের দোকানগুলোতেও বেশ ভিড় দেখা যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক পরিবার শিশুদের হাত ধরে দোকান থেকে দোকানে ঘুরছেন। কেউ নতুন পাঞ্জাবি, কেউ শাড়ি, আবার কেউ জুতা বা প্রসাধনী কিনছেন। নতুন পোশাক হাতে পেয়ে ছোট শিশুদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। তবে এই আনন্দঘন পরিবেশের মাঝেও অনেক স্বল্প আয়ের মানুষের মুখে হতাশা স্পষ্ট। বাজারে এসে পছন্দের পোশাক দেখলেও দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।

শহরের কলাতলী এলাকায় কাজ করা গুরামিয়া নামের এক দিনমজুর বলেন, বাজারে অনেক সুন্দর কাপড় আছে, কিন্তু দাম অনেক বেশি। পরিবারের সবার জন্য কেনা সম্ভব না। চেষ্টা করছি অন্তত ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু কিনে দিতে।

ইমরান উদ্দিন নামের এক নির্মাণ শ্রমিক বলেন, সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তবুও ঈদ বলে কথা, বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু না কিছু কিনতেই হবে।

মার্কেটের পাশাপাশি ফুটপাতের দোকানগুলোতে তুলনামূলক কম দামে পোশাক বিক্রি হওয়ায় সেখানে ক্রেতাদের ভিড় বেশি দেখা গেছে। অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ সেখান থেকেই ঈদের কেনাকাটা সারছেন।

কক্সবাজার দোকান মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ঈদকে সামনে রেখে এখন মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। বিশেষ করে বিকেল ও রাতের দিকে বেশি মানুষ কেনাকাটা করতে আসছেন। আমরা আশা করছি ঈদের আগের শেষ কয়েক দিনে বাজার আরও জমে উঠবে।

সাজু/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ office.bd24live@gmail.com