ছুটির আমেজে ভরপুর থাকার কথা ছিল কক্সবাজার থেকে ঢাকামুখী ট্রেনযাত্রা। কিন্তু সেই পথই এখন অজানা আতঙ্কে মোড়ানো। সন্ধ্যা নামলেই জানালার বাইরে অন্ধকারের সঙ্গে যেন ওত পেতে থাকে ঝুঁকি- হঠাৎ ছুটে আসা পাথর, ভেঙে চুরমার কাচ, আর মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে পড়ে যাত্রী। কয়েক সেকেন্ডের এমন আঘাত পুরো বগিকে স্তব্ধ করে দেয়, নেমে আসে চিৎকার আর ভয়ের ছায়া।
টানা একের পর এক পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় কক্সবাজার-ঢাকা রুটের ট্রেন এখন আর শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, অনেকের কাছে তা হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তার যাত্রা। চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনেই ছয়বার হামলা, আহত একাধিক যাত্রী- সব মিলিয়ে নিরাপদ ট্রেনযাত্রা হয়ে উঠেছে অদৃশ্য এক ঝুঁকি ও অজানা আতঙ্ক।
শনিবার (১৪ মার্চ) রাত সোয়া আটটার ঘটনাটি যেন এই উদ্বেগকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। রামু স্টেশন থেকে ছেড়ে ঈদগাঁর দিকে যাচ্ছিল পর্যটক এক্সপ্রেস। ট্রেনটি গতি নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে থেকে ছুটে আসা একটি পাথর সরাসরি আঘাত হানে ১১ বছর বয়সী শিশু অর্ণন চৌধুরীর মুখে। রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে ঘিরে ধরে পরিবার, আশপাশের যাত্রীরা ছুটে আসেন সাহায্যে। ট্রেনের ভেতর মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা।
এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনেই কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ছয়বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে আহত হয়েছেন তিনজন যাত্রী।
গত এক বছরের পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক ৪০টির বেশি ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার পেছনে আছে নিরাপত্তাহীন এক যাত্রার গল্প।
রেলওয়ে রেঞ্জ পুলিশের জিআরপি সূত্র জানায়, ৫ মার্চ থেকে পাথর নিক্ষেপ ঠেকাতে সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করা হয়। মাইকিং, মসজিদে ঘোষণা- সব মিলিয়ে স্থানীয়দের সতর্ক করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব উদ্যোগের মধ্যেই হামলা থামেনি। বরং প্রচারণা চলাকালীন সময়েই নতুন করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এর আগে ৯ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাতকানিয়া ও ডুলাহাজরার মধ্যবর্তী এলাকায় পর্যটক এক্সপ্রেসকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়। তারও আগে ৩ মার্চ রাত সাড়ে ৮টার দিকে রামু ও ঈদগাঁর মধ্যবর্তী জোয়ারিয়া নালা এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল হঠাৎ করেই চারদিক থেকে ট্রেনকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি জানালার কাচ ভেঙে যায়। আহত হন অন্তত দুইজন, যার মধ্যে একজনের অবস্থা ছিল গুরুতর। এর আগের দিন, ২ মার্চ, চকরিয়ার ডুলাহাজারা এলাকায় একই ধরনের হামলায় গুরুতর আহত হন রেলের বেডিং পোর্টার ছাবের আহমদ। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার মাথায় একাধিক সেলাই দিতে হয়।
ঘটনাগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, রামু থেকে ঈদগাঁ পর্যন্ত নির্জন রেলপথের কিছু অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে তিনটি কালভার্টকে সম্ভাব্য অপরাধস্থল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব জায়গার চারপাশে বিস্তৃত বিল, ঝোপঝাড় ও পাহাড়ি পরিবেশ থাকায় দুর্বৃত্তরা সহজেই আড়াল নিতে পারে।
৩ মার্চের ঘটনায় একটি কালভার্টের নিচ থেকে সংঘবদ্ধভাবে পাথর নিক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে ধারণা জোরালো হচ্ছে, ঘটনাগুলো আকস্মিক নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে। অনেক যাত্রী এই হামলাগুলোকে সম্ভাব্য ডাকাতির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, ট্রেনকে থামানো বা গতি কমানোর জন্যই এভাবে পাথর নিক্ষেপ করা হতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ছিদ্দিকুর রহমানও একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, নির্জন এলাকায় ব্রিজ বা কালভার্টের কাছে দলবদ্ধভাবে পাথর ছোড়া সাধারণত ট্রেন থামানোর একটি কৌশল, যা ডাকাতির উদ্দেশ্যে করা হয়।
৩ মার্চের ঘটনার সময় ট্রেনের চালক শামীম তালুকদার জানান, জায়গাটি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় তিনি দ্রুত গতিতে এলাকা পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হলেও যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এত ঘটনার পরও আইনি পদক্ষেপের অভাব নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। ২ ও ৩ মার্চের মতো গুরুতর ঘটনার পরও কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে জিআরপি। এতে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা করতে পারত। কিন্তু কেন তা করা হয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অনেক ক্ষেত্রে সাড়া মেলেনি।
এদিকে আরেকটি দৃষ্টিকোণও সামনে আসছে। ঈদকে সামনে রেখে যাত্রী পরিবহনে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ সন্দেহ করছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রেনযাত্রীদের মধ্যে ভয় তৈরি করার চেষ্টা থাকতে পারে। সড়ক পরিবহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও বিষয়টি তদন্তের দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ। রামু থেকে ঈদগাঁ পর্যন্ত রেলপথে দুটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতন করতে মাইকিং ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজার-ঢাকা রুটটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ, বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সেই রুটে যদি যাত্রীরা নিজেদের নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে তা শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিই বাড়াবে না, বরং সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলবে।
রাতের ট্রেনে এখন অনেকেই জানালার পাশে বসতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ পর্দা টেনে দিচ্ছেন, কেউ মাথা নিচু করে বসে থাকছেন। গন্তব্যে পৌঁছানোই যেন একমাত্র লক্ষ্য- কিন্তু সেই যাত্রাপথে নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা সহজে কাটার নয়।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই হতে পারে একমাত্র সমাধান। নইলে কক্সবাজার থেকে ঢাকার ট্রেনযাত্রা ধীরে ধীরে স্বস্তির পরিবর্তে ভয়ের প্রতিশব্দ হয়ে উঠবে- যেখানে প্রতিটি জানালা হয়ে উঠবে সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখ, আর প্রতিটি যাত্রা এক অনিশ্চিত অপেক্ষা। এমনটাই মনে করছেন যাত্রীরাসহ সংশ্লিষ্টরা।
বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া গণ্যমাধ্যমে জানান, আহত হওয়ার ঘটনার পর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দায়িত্বে কোনো গাফিলতি আছে কি না, তা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জিআরপির সহকারী পুলিশ সুপার রিজওয়ান সাঈদ জিকু বলেন, রামু থেকে ঈদগা পর্যন্ত রেলপথের চারপাশে বিল, বন ও পাহাড় থাকায় মানুষের বসতি খুব কম। তাই ওই এলাকায় দুটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের কাজ চূড়ান্ত হয়েছে। ৫ মার্চ থেকে রামু স্টেশন এলাকা ও মসজিদে পুলিশ সুপারের নির্দেশে জনসচেতনতা কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর