মাথার ওপর মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি, আর নিচে মুসল্লিদের জনসমুদ্র। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! আর সেই মেঘ-বৃষ্টির ভ্রুকুটি উপেক্ষা করেই বরাবরই লাখো মুসল্লির পদভারে মুখরিত হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। এবার সেই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান যেন নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী হলো। পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাতকে ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মহামিলন কেন্দ্র হয়ে ওঠলো ঐতিহ্যবাহী এ ঈদগাহ ময়দান। আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আনুগত্য প্রকাশের দৃষ্টান্ত রাখতে অন্তত সাত লাখ মুসল্লি অংশ নিলেন শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে।
লাখো কণ্ঠের 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি আর দুই হাত তুলে মোনাজাতের মধ্য দিয়ে নরসুন্দা নদীর তীরে তৈরি হয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ।
শনিবার সকাল ১০টায় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হলেও সকাল ৯টার মধ্যেই জনসমুদ্রে পরিণত হয় ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। তখনো চলছিল শোলাকিয়া অভিমুখে মুসল্লিদের ঢল। লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে একত্রিত হওয়ার বিরল অভিজ্ঞতা ও মানসিক প্রশান্তির জন্য শোলাকিয়া অভিমুখে ছুটে আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল হৃদয়। ফলে জামাত শুরুর আগেই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান ছাড়িয়ে মাঠের আশে-পাশের রাস্তা, ঈদগাহ পুকুর, শোলাকিয়া সেতু, সেতু পেরিয়ে কিশোরগঞ্জ-করিমগঞ্জ সড়কে ছড়িয়ে যায় জনস্রোত। তাতেও জায়গা না পেয়ে বাসাবাড়ির ছাদ, উঠান, অদূরের গাছবাজার এলাকা এবং বিভিন্ন গলিপথে জামাতের জন্য দাঁড়ান বিপুল সংখ্যক মুসল্লি। স্বভাবতই শোলাকিয়ার ঈদ জামাত হয়ে যায় এক মহাসমুদ্র। লাখো কণ্ঠের আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শোলাকিয়া ঈদগাহ এলাকা। এতো বড় ঈদ জামাত এর আগে কখনো দেখেনি শোলাকিয়া।
ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এবার ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। শোলাকিয়ার মূল ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ ঈদ জামাতে ইমামতি করেন। রেওয়াজ অনুযায়ী, সকাল ১০টায় ঈদ জামাত শুরু হওয়ার ১৫, ৫ ও ১ মিনিট আগে শর্টগানের ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়। জামাত শেষে ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর জন্য মঙ্গল কামনা. পাপ থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর রহমত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। লাখো মুসল্লির উচ্চকিত হাত আর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আমীন, আমীন ধ্বনিতে এ সময় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো ঈদগাহ এলাকা।
ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে এবারও নেওয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠে স্থাপন করা হয় ওয়াচ টাওয়ার। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয় ঈদগাহ ময়দান, আশেপাশের এলাকা এবং অলিগলিসহ মাঠ সংলগ্ন চারপাশ। পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এবারো যুক্ত ছিল ড্রোন। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান এবং পুলিশের ১১০০ জন সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেড় হাজারের মতো সদস্য দিয়ে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানকে। ঈদগাহ ময়দানের প্রবেশপথে স্থাপিত আর্চওয়ে দিয়ে মুসল্লিদের ঢুকতে হয় ঈদগাহ ময়দানে। এর আগে আরো অন্তত কয়েক দফা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের দেহ তল্লাসি করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ নিয়ে ঈদগাহে ঢুকতে দেয়া হয়।
ঈদের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ২টি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করেছে। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে আসে এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে আসে। মাঠের সুনাম ও জনশ্রুতির কারণে কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের সমাগম ঘটে।
ঈদ জামাত শুরুর আগে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন এবং জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান মুসল্লিদের স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।
প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি বলেন, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া মাঠ কিশোরগঞ্জের একটি ইতিহাস-ঐতিহ্য। আমাদের গর্বের ব্যাপার। এই মাঠকে দিয়েই কিশোরগঞ্জের পরিচিতি। পাগলা মসজিদ কিশোরগঞ্জের আরেকটি ঐতিহ্য। সত্যিকার অর্থে শোলাকিয়া মাঠে মুসল্লিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, ওজুর ব্যবস্থা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বসার ব্যবস্থা, পারিপাশির্ক যে বিষয়গুলো আছে, দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও সেই নাম ও যশের সাথে উন্নয়নের সেই সম্পর্কটার মিল খুঁজে পাই না। ইনশাআল্লাহ, আমরা আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি, আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেব এ ব্যাপারে অবগত আছেন। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে অতি দ্রুত শোলাকিয়া মাঠের উন্নয়নের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সার্বিকভাবে আমরা একটি প্রকল্প গ্রহণ করবো, ইনশাআল্লাহ। আমরা আজকে আপনাদের কাছে দোয়া চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য, বর্তমান সরকারের জন্য। আপনারা যে আশায় এবং ভরসায় যে দায়িত্ব দিয়েছেন, আমরা যেন মানুষের প্রত্যাশার জায়গায়, কল্যাণের জায়গায়, আমরা যাতে সেই কাজগুলো করতে পারি। সার্বিক উন্নয়নে আমরা কাজগুলো করতে পারি। আজকের আমরা এই ঈদগাহ মাঠে দোয়া করবো মুসলিম উম্মাহর জন্য। অত্যাচারী-জালেম যারা মুসলমানদেরকে নানা জায়গায় নিগৃহীত করেছে, অত্যাচার, জুলুম করেছে। আল্লাহর কাছে আমরা ফরিয়াদ করবো, এই জালেমদেরকে হেদায়েত দিক না হলে ধ্বংস হোক। আমরা মুসলমানদের মুক্তির জন্য দোয়া করবো। আমরা পুরো বাংলাদেশের জন্য দোয়া করবো যাতে আমরা একসাথে মিলেমিশে, দলমতের উর্ধ্বে ওঠে আমরা কাঙ্খিত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে একসাথে কাজ করতে পারি। কিশোরগঞ্জের উন্নয়নে আমরা ৬টি সংসদীয় আসনের সবাই মিলে সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে পারি।
প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে কিশোরগঞ্জবাসীসহ সারা বাংলাদেশের মুসলমানদের পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানান।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বলেন, শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান কিশোরগঞ্জবাসীর গর্ব। শুধু বাংলাদেশে নয় বহির্বিশেও মুসলমানদের কাছে এই মাঠের পরিচিতি রয়েছে। আজকে এই মাঠে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আপনারা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে এই ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে নামাজ আদায়ের জন্য এসেছেন, আমি কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে আপনাদের অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা জানাই। আমি আশা করি, আপনারা নিরাপদে এখানে এসেছেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাবেন।
ঈদ জামাতে জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।
জামাতে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের মধ্যে গাজীপুর জেলার কাশিমপুর এলাকার হাজী সিরাজ মল (৭৭) জানান, গত ৫৪ বছরে শোলাকিয়া মাঠে তাঁর কোন জামাত বাদ পড়েনি। তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষের সাথে আল্লাহর সামনে হাজির হই। লাখ লাখ হাতের সঙ্গে আমিও দুই হাত তুলে দেশ ও দশের মঙ্গল কামনা করে মোনাজাত করি। এ এক বিরল অভিজ্ঞতা ও শান্তি। তাই বাড়িতে বসে থাকতে পারি না। শত কষ্ট উপেক্ষা করে চলে আসি শোলাকিয়ায়।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর