বাইরে নতুন জামার ঘ্রাণ, খুশির কোলাহল আর রঙিন আলোকসজ্জা। অলিগলি মেতেছে পুনর্মিলনের উৎসবে। কিন্তু বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের জোয়ানপুর গ্রামের একটি ফটকের ভেতরে সময় যেন থমকে আছে কয়েক দশক আগে। ফটকের নেমপ্লেটে লেখা ‘সোনাভান বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র’। সেখানে ঈদ মানে রঙিন কোনো উৎসব নয়, বরং ধূসর স্মৃতির জানালায় এক চিলতে রোদের অপেক্ষা। এই কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া ২১ জন প্রবীণের কাছে ঈদ এক ভিন্ন বাস্তবতার নাম। তাদের দিন কাটে দীর্ঘশ্বাসে, রাত কাটে ফেলে আসা প্রিয় মুখগুলোর ছবি হাতড়ে। একসময় যারা ছিলেন নিজ নিজ সংসারের বটবৃক্ষ, আজ তারা বার্ধক্যের ভারে অবহেলিত, নিজ আঙিনায় ‘অপ্রয়োজনীয়’।
গাইবান্ধার সবুরা বেগমের জীবনের গল্পটি অন্য সবার চেয়ে একটু বেশিই বিষণ্ণ। তার একাকীত্ব আজকের নয়, শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সাল থেকে। স্বামী থাকলেও দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ। নিজের কোনো সন্তান নেই, নেই কোনো ঘনিষ্ঠ স্বজন। ঢাকার যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে ছয় বছর আগে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন এই সোনাভানে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সবুরা বলেন, "আমার তো কেউ নাই বাবা। ঈদ আসলে মনে হয়, যদি কেউ পাশে বসত, একটু গল্প করত! মানুষ যখন হাসে, আমার তখন বুকটা ফেটে যায়।" তার কাছে এখন ঈদের আনন্দ মানে কেবলই অন্যের আনন্দ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা।
বগুড়া শহরের মালগ্রামের মহিদুল ইসলাম (৭৫) একসময় ছিলেন শহরের সফল ঠিকাদার। সচ্ছল জীবন, সম্মান সবই ছিল তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু পাঁচ বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যু যেন তার সাজানো পৃথিবী ওলটপালট করে দেয়। তিন মেয়ে আছেন, প্রত্যেকের ঘর-সংসার আছে। কিন্তু বাবার জন্য সেই ঘরগুলোতে জায়গা হয়নি। এক বুক হাহাকার নিয়ে মহিদুল বলেন, "সব ছিল একসময়, এখন কিছুই নাই। মেয়েরা আছে, কিন্তু তাদেরও সংসার। ঈদের সময় খুব খারাপ লাগে। মেয়েরা যখন ফোন করে দোয়া চায়, তখন কথা বলতে পারি না, চোখ দিয়ে পানি পড়ে।"
প্রায় শতবর্ষী বাদশা প্রামাণিকের গল্পটিও একই মুদ্রার অন্য পিঠ। দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা তিনি। একসময় সন্তানদের মানুষ করতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন। কিন্তু বয়স যখন হাতের লাঠির ওপর নির্ভরশীল হলো, তখন তিনি পরিবারের কাছে হয়ে উঠলেন ‘বোঝা’। সেই ভার সইতে না পেরে শেষ ঠিকানা হয়েছে এই আশ্রয়কেন্দ্র। বিষণ্ণ মনে তিনি বলেন, "ছেলে-মেয়ে আছে, কিন্তু কাছে নাই। বয়স হইলে মানুষরে আর কেউ চায় না বাবা।"
বর্তমানে এই কেন্দ্রের ২১ জন বাসিন্দার মধ্যে ১৪ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ। কেউ এখানে ৮ বছর ধরে আছেন, কেউবা নতুন। এদের অনেকের স্বজন আর খোঁজ নেন না, আবার কারো যোগাযোগই নেই। তাই এই চার দেওয়ালের বাসিন্দারাই এখন একে অপরের ভাই, বোন বা স্বজন। ঈদের দিনটি এখানে কাটে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। সকালে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সেমাই, পায়েস, খিচুড়ি ও ডিমের আয়োজন করা হয়। দুপুরে পরিবেশন করা হয় বিরিয়ানি বা উন্নতমানের মাংস। কিন্তু খাবারের স্বাদ ছাপিয়ে প্রবীণদের মনে বড় হয়ে দাঁড়ায় প্রিয়জনের অনুপস্থিতি। তবুও ডাইনিং টেবিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার সময় তারা একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নেন।
২০১৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মজিদ খান। নিজের মায়ের নামে করা এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে তিনি প্রবীণদের জন্য আধুনিক আবাসন ও নিয়মিত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করেছেন। প্রবাসে থেকেও তিনি সার্বক্ষণিক এর তদারকি করেন। পুনর্বাসন কেন্দ্রে ডা. আসিফ ইকবাল সনি দেখতে যান তাদের, এ সময় তিনি বলেন, "তাদের দুঃখের কথা শুনলে হৃদয় কেঁপে ওঠে।" কেন্দ্রের উপ-সহকারী মেডিকেল কর্মকর্তা বিজন কুমার পাল বলেন, "এখানে যারা আছেন, তারা প্রায় সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং অবহেলার শিকার। আমরা চেষ্টা করি তাদের সুচিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে প্রফুল্ল রাখতে। কিন্তু স্বজনদের যে অভাব, তা আমাদের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়।"
সোনাভানের এই বাসিন্দাদের কাছে ঈদ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ। সমাজের সহৃদয় মানুষরা উপহার নিয়ে এগিয়ে আসলেও, নাড়িছেঁড়া ধনের অভাব ঘুচবে না কোনো আয়োজনেই। তাদের ঈদ তাই বর্ণহীন, কেবলই এক চিলতে অপেক্ষা আর না পাওয়া ভালোবাসার নীরব হাহাকার।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর