টালিউড জগতে নেমে এসেছে গভীর শোক। জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় আর আমাদের মাঝে নেই—তার আকস্মিক প্রয়াণে স্তব্ধ গোটা ইন্ডাস্ট্রি।
রোববার পশ্চিমবঙ্গের তালসারিতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়েছিলেন ৪৩ বছর বয়সী এই অভিনেতা। শুটিং চলাকালীন একসময় তিনি সমুদ্রে নামেন। হঠাৎ করেই তলিয়ে গেলে সেটে উপস্থিত টেকনিশিয়ানরা তাকে উদ্ধার করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে তার ছেলে সহজের উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠি। ব্যক্তিজীবনে ২০১০ সালে অভিনেত্রী প্রিয়াংকা সরকারকে বিয়ে করেছিলেন রাহুল।
চিঠিতে সহজকে উদ্দেশ্য করে তিনি লিখেছিলেন—
আজ ‘ফাদার্স ডে’ উপলক্ষে এই চিঠি লিখছি। যদিও আমি পুরোপুরি বাংলা মিডিয়ামের মানুষ, আগে কখনও ‘ফাদার্স ডে’ বা ‘মাদার্স ডে’ আলাদা করে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু এখন মনে হয় এসব উদযাপন করা মানে তোমাকে কাছে পাওয়ার একটা অজুহাত।
জানো সহজ, তোমার মায়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব তখন থেকেই, যখন ওর বয়স ছিল ১৪ আর আমার ২১। সিরিয়ালে আমরা প্রায়ই ভাইবোনের চরিত্রে অভিনয় করতাম। বয়সে ছোট হওয়ায় আমাদের শুটিং হতো শেষে, আর সেই সময়টায় আমরা সেটের কোণে বসে গল্প করতাম। তোমার মা ছিলেন বেহালার এক অ্যাকাউন্টস শিক্ষকের মেয়ে, আর আমি এক সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীর ছেলে। এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না, শুধু মন দিয়ে অভিনয় করতাম।
এই গল্পটা বলছি যাতে তুমি বুঝতে পারো—যদি কখনও এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তুমি কতটা সৌভাগ্যবান। কারণ এই জায়গায় পৌঁছাতে তোমার বাবা-মাকে অনেক অপমান আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। তাই সবসময় মানুষের প্রাপ্য সম্মান দেবে। যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছে, সে হয়তো কোনোদিন তোমার বাবা-মাকেও তুচ্ছ করেছে। অর্থ বা ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে বিচার করা আসলে অজ্ঞতার লক্ষণ—এই ভুল তুমি কখনও করো না।
যেদিন আমরা জানতে পারলাম তুমি আমাদের জীবনে আসছো, আমরা আনন্দে ভেসে গিয়েছিলাম। তোমার মা তখন নানা অ্যাপ ডাউনলোড করে প্রতিদিন তোমার বেড়ে ওঠার খবর দিত—কখন আপেলের মতো, কখন আনারসের মতো! আর যখন তুমি জন্মালে, তোমার মায়ের এক অন্য রূপ দেখলাম। সে কখনও তোমাকে বাজারের তৈরি বেবিফুড খাওয়ায়নি—সব নিজের হাতে বানিয়েছে, যত কষ্টই হোক।
তোমার জন্য তোমার মায়ের ত্যাগ আর সংগ্রাম অপরিসীম। হয়তো সবটা তুমি মনে রাখবে না—তা তোমার ব্যাপার। আজও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোমার মাকে নানা কটূ মন্তব্য শুনতে হয়, কিন্তু সেলিব্রিটি হতে গেলে এসব সহ্য করার শক্তি রাখতে হয়—এটা আমরা শিখেছি।
আমি শুধু চাই, তুমি যেন তোমার মায়ের লড়াইটা বোঝার চেষ্টা করো। আমরা সন্তানেরা মায়ের ভালোবাসা অনুভব করি, কিন্তু তার কষ্টগুলো দেখতে পাই না। তোমার মা সেই কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। তুমি যদি সেই ক্ষত সারাতে না-ও পারো, তোমার একটু ভালোবাসাই তার জন্য অনেক।
শেষে যেন একটু হাসি-ঠাট্টার সুরেই তিনি লিখেছেন—
“এখন হয়তো তুমি ভাবছো, আমি কে যে তোমাকে এত উপদেশ দিচ্ছি! আমি তোমারই বাবা—হোক না দূর সম্পর্কের মতো, তবুও বাবা তো বটেই! আর সেই সূত্রেই একটু জ্ঞান দেওয়ার অধিকার তো থাকেই।
তোমার জন্য আমি রেখে যাচ্ছি আমার সব ভালোবাসা, আমার দেখা সব নদী, পাহাড়, জঙ্গল—সবকিছুকে তুমি নিজের উত্তরাধিকার ভাবতে পারো। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাত—এসবও যেন তোমার নিজের সম্পদ হয়ে থাকে।
আর একটা জিনিস তোমাকে দিচ্ছি, যেটা নিয়ে আমার ভীষণ গর্ব—আমার ভাষা, বাংলা ভাষা। শুধু দক্ষিণ কলকাতার কথ্য বাংলা নয়, এই ভাষার সব রকম উপভাষা, তার বৈচিত্র্য আর ঐশ্বর্য—সবটাই তোমার জন্য রেখে গেলাম। এগুলোই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর সবটাই তোমার।”
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর