দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের মাঠে হলুদ রঙের সমারোহ। পাখির চোখে দেখলেও যেন শেষ হবে না মাঠের বিস্তৃতি। পার্বত্য উপজেলা লামার গ্রামীণ পথ ধরে এগুতেই চোখে পড়বে অসংখ্য সূর্যমুখী ফুলের বাগান। সূর্যমুখী বেশ পরিচিত একটি ফুল। সূর্যের দিকে মুখ করে ফুটে বলে এর নাম সূর্যমুখী ফুল। এর বীজ একটি তেল জাতীয় ফসল। তেল ছাড়াও এ বীজ নানাভাবে খাওয়ার উপযোগী।
যেমন, কাঁচা বা হালকা শুকনো বীজ খোলায় ভাজা করে, সালাদ, দই, স্মুদি বা ওটসের সাথে মিশিয়ে খাওয়া যায়। এছাড়াও গুঁড়ো করে স্যুপে বা বেকিং পাউডারে যোগ করে এবং ঘরেই বীজ দিয়ে স্বাস্থ্যকর বাটার তৈরি করা যায়। তবে তেলের জন্য বিশ্বব্যাপী এর পরিচিতি রয়েছে।
এবছর বান্দরবানের লামায় অনেক কৃষক তামাক ছেড়ে সূর্যমুখী ফুল চাষ করেছেন। তামাকের আগ্রাসন বন্ধ করতে বিকল্প চাষ হিসেবে সরকারও কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে। সরকারি প্রণোদনায় উপজেলায় ৫.৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ হয়েছে। ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। চাষীরাও লাভের স্বপ্ন দেখছেন।
লামা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, ভাদ্র-আশ্বিন (মধ্য আগষ্ট থেকে মধ্য অক্টাবর) মাস সূর্যমুখী ফুল চাষের উপযুক্ত সময়। জমিতে ৪-৫টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরে ও আগাছামুক্ত করে বীজ বপন করতে হয়। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২০ ইঞ্চি এবং সারিতে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০ ইঞ্চি রাখতে হয়। বীজের পরিমান শতক প্রতি ৩৫-৪০ গ্রাম। গোবর, ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, দস্তা, ম্যাগনেশিয়াম, বোরণ এবং অর্ধেক ইউরিয়া শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। অবশিষ্ট অর্ধেক ইউরিয়া দুইবারে প্রথমভাগ চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর এবং দ্বিতীয় ভাগ ৪০-৪৫ দিন পর ফুল ফোটার পর্বে প্রয়োগ করতে হয়। ফুলটি যখন নুয়ে পড়ে এবং পেছনের অংশ হলুদ বা বাদামী বর্ণ ধারণ করে, পাপড়ি পড়ে যাওয়ার পর এবং দানাগুলো শক্ত ও কালো হলে এটি কাটার সময় হয়। সর্বোপরি সূর্যমুখী বীজ রোপণের ৯০-১০৫ দিনের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা যায়। বিঘা প্রতি ৭ থেকে ১০ মণ ফলন পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রতি কেজি সূর্যমুখী ফুলের বীজের দাম সাধারণত ৫০০ টাকা থেকে ১,৩০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে, যা বীজের মান, ধরন (খোসাযুক্ত/ছাড়ানো) এবং ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর করে।
উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অভিজিৎ বড়ুয়া জানান, ৪০জন চাষীকে ১ বিঘা করে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। তারমধ্যে পৌর এলাকায় .৮০ হেক্টর, গজালিয়া ইউনিয়নে .৭০ হেক্টর, সদর ইউনিয়নে .৬০ হেক্টর, রূপসীপাড়া ইউনিয়নে .৯০ হেক্টর, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে .৭০ হেক্টর, আজিজ নগর ইউনিয়নে. ৬০ হেক্টর,ফাইতং ইউনিয়নে .৯০ হেক্টর জমিতে। এখন সূর্যমুখীর ফলন তোলার সময়। আর কয়েক দিনের মধ্যে চাষীরা ফসল ঘরে তুলতে পারবে। ফলন দেখে বুঝা যাচ্ছে চাষীরা খরচ পুষিয়ে লাভের মুখ দেখবে।
এদিকে লামা পৌরসভার ছাগলখাইয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লামা-আলীকদম সড়কের পাশে বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে চোখ জোড়ানো সূর্যমুখী ফুলের বাগান। প্র্রতিটি গাছে বড় আকারে তরতাজা হলুদ ফুল সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। পুরো বাগান দেখলে মনে হয় যেন সবুজের উপর এক টুকরো হলুদ চাদরে ঢাকা। হলুদের এ সমারোহ নজর কাড়ছে সকলের।
ছাগলখাইয়া মৌজার হেডম্যান মংক্যচিং মার্মা এ বাগানের মালিক। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বীজ সংগ্রহ করে ৪০শতক জমিতে প্রথম বারের মত সূর্যমুখী ফুল চাষ করেন তিনি। একটু দেরিতে ডিসেম্বরের শেষের দিকে তিনি বীজ রোপন করেন। এখন প্রতিটি গাছে বড় বড় তরতাজা ফুল এসেছে। ফুল দেখে তার মুখে হাসি ফুটেছে। এপর্যন্ত তার খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকা। ফসল তোলার সময় আরও ৫ হাজার টাকা শ্রমিক খরচ ধরলে ৪০ শতক জমিতে তার সর্বমোট খরচ হবে ১৫ হাজার টাকা। ১৫ থেকে ২০ মন ফলন পাবেন বলে আশা করছেন তিনি। খোসাযুক্ত কাঁচা বীজ প্রতি কেজি ২০০ টাকা হলেও খরচ বাদে তার লক্ষাধিক টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন।
উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের গতিরাম পাড়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়,সজারাম ত্রিপুরা নামে এক যুবক চাষী কৃষি বিভাগের পরামর্শে ১০ শতক জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন। তার জমিতেও ফসল খুব ভালো হয়েছে। প্রতিটি গাছের আগায় বড় বড় হলুদ বর্ণের ফুল। এ ফুল দেখে খুশি চাষী সজারাম।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, সূর্যমূখীর তেল বাজারের অন্যান্য তেলের চেয়ে অনেক পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত। আমরা এ বছর ১ বিঘা করে প্রায় ৫.৫ হেক্টর জমিতে চাষ করার জন্য ৪০জন কৃষককে বীজ ও সার প্রদান করেছি। প্রণোদনায় আবাদকৃত জমিতে পরিদর্শনে দেখা যায়, ফলন খুব ভালো হয়েছে। আশা করছি চাষীরা লাভের মুখ দেখবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর