মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় চট্টগ্রামজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত তেল। এরই মধ্যে তেলের সরবরাহ, মূল্য এবং বিতরণব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নগর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কোথাও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহ—সব মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থার পেছনে সরবরাহ চাপের পাশাপাশি বেপরোয়া মজুদদারদের তৎপরতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, অনেক পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও ‘সংকট’ দেখিয়ে বিক্রি সীমিত করা হচ্ছে। আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
ফিলিং স্টেশন মালিকরা বলছেন, চাহিদার অর্ধেক জ্বালানি তেলও ডিপো থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে রেশনিং পদ্ধতিতেই তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। তাছাড়া ঈদের ছুটিতে ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক ডিলার সময়মতো পে-অর্ডার করতে পারেননি, যার ফলে ডিপো থেকে তেল উত্তোলনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিপিসির তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রোল পাম্প আছে ৩৮৩টি। আর এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন। প্যাকড পয়েন্ট ডিলার আছেন ২৫৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে পেট্রোল পাম্প আছে ৪৬টি। যার অধিকাংশই বন্ধ।
পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে ডিজেলের কোনও সংকট নেই। তবে অকটেনের সংকট আছে। বর্তমানে পেট্রল পাম্পগুলো চাহিদা অনুযায়ী অকটেন মিলছে না। তেল নিয়ে সংকট শুরুর পর অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের চাহিদা হঠাৎ বেড়েছে। তবে সরবরাহ আগের মতোই আছে।’
এদিকে, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি (ডিজেল) না পাওয়ায় সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা। ফলে ভরা মৌসুমেও ঘাটে অলস সময় পার করছেন হাজারো জেলে। ফিলিং স্টেশন বা ডিলাররা চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ করতে পারছেন না। রেশনিং পদ্ধতিতে যে পরিমাণ ডিজেল দেওয়া হচ্ছে তাতে মাঝ সাগরে গিয়ে আবার ফিরে আসার মতো পরিস্থিতি থাকছে না। এ অবস্থায় মৎস্য আহরণেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।
জানা যায়, চট্টগ্রামে কয়েক হাজার ফিশিং ট্রলার থাকলেও সাগরে নিয়মিত মাছ ধরে অন্তত কয়েকশ। মাছ ধরার জেলে রয়েছেন ২ লাখের মতো। সমুদ্রগামী একটি ট্রলারের ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী এক হাজার থেকে দুই হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল ধারণক্ষমতা রয়েছে।
জলদাশ নামে ফিশিং ট্রলারের এক মালিক জানান, তার কাছে সাতটি ট্রলার রয়েছে। যেগুলো তিনি ভাড়া দেন। এর মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে চারটি ঘাটে বসে আছে। অন্য তিনটি এক সপ্তাহ আগে সমুদ্রে গেছে। তবে সেগুলো ফিরে এসে পুনরায় সাগরে যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত তিনি।
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ৯৮টি অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ১৮ থেকে ২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘দেশে জ্বালানির কোনও ঘাটতি নেই। এ পর্যন্ত প্রায় ১০টি জাহাজ এসেছে এবং সিঙ্গাপুর থেকে একটি জাহাজ রওনা হয়েছে, যাতে প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। সেটি মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করবে। গত দুই দিনেও আরও দুটি জাহাজ থেকে তেল খালাস হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে অকটেন, পেট্রল ও ডিজেল মজুত রয়েছে। তাই আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সংগ্রহ করুন। কেউ অতিরিক্ত মজুত করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর