ইরানের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে টানা ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা। তবে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভূগর্ভস্থ মিসাইল বাঙ্কার হামলার পরপরই মেরামত করে ফেলছে ইরান।
অর্থাৎ হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান সেগুলোকে ফের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছে। আর এমন তথ্য সামনে আসায় যুদ্ধের বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার সচল করা এবং ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখার ক্ষমতা দেখিয়ে ইরান বোঝাচ্ছে, সংঘাত এখনও অনেক দূর যেতে পারে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের মধ্যে নতুন গোয়েন্দা তথ্য সামনে এসেছে। সেখানে বলা হচ্ছে হামলার পরও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার পর ইরান কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কারগুলো আবার চালু করছে।
অবশ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা কমে যাওয়াকে হোয়াইট হাউস তেহরানের আক্রমণ সক্ষমতা ধ্বংসের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও মোবাইল লঞ্চার ধরে রেখেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো দ্রুত মেরামত করছে।
চলতি সপ্তাহে টেলিগ্রাফকে বিশ্লেষকেরা বলেন, হামলার সংখ্যা কমে আসা থেকে বোঝা যায় ইরান কৌশল বদলাচ্ছে এবং লঞ্চার ব্যবহার করে দ্রুত সরিয়ে ফেলায় আরও দক্ষ হয়ে উঠছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যতটা সম্ভব অক্ষত রাখতে চায়, যাতে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে চাপ বজায় রাখা যায় বা যুদ্ধ শেষে পুরো অঞ্চলকে হুমকির মুখে রাখা যায়।
এই সপ্তাহের এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানায়, যুদ্ধের প্রথম পাঁচ সপ্তাহে ইরানে ১১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীও জানিয়েছে, ৭ মার্চ পর্যন্ত ইরানের তিন-চতুর্থাংশ ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে নতুন এই মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে— যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান কতটা সফলভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে পেরেছে। কারণ, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখনও উপসাগরীয় অঞ্চলে লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া হামলার সংখ্যা কমলেও ইরানের হামলার সক্ষমতা এখনও অটুট আছে। যুদ্ধের শুরুতে প্রতিদিন শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও এখন তা কমে দৈনিক ৪০টির নিচে নেমে এসেছে, যার মধ্যে প্রায় ২০টি ইসরায়েলের দিকে ছোড়া হয়।
অন্যদিকে, ইরান প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি আক্রমণাত্মক ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাঠাচ্ছে। এর বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূপাতিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বিপুলসংখ্যক লঞ্চার ধ্বংস করার পর বাকি লঞ্চার খুঁজে বের করে ধ্বংস করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, ইরানের হামলা কমে যাওয়ার নেপথ্যে অন্য কারণ থাকতে পারে। তাদের মতে, হামলা থেকে বাঁচাতেই অধিকাংশ মিসাইল লঞ্চার পাহাড়ের গুহা বা মাটির নিচের গোপন বাঙ্কারে লুকিয়ে ফেলেছে ইরান। সুযোগ বুঝে সেগুলো ফের ব্যবহার করা হতে পারে।
ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি বড় চ্যালেঞ্জ
ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ভূগর্ভস্থ টানেল ও ঘাঁটিতে লুকিয়ে রাখছে, যেগুলোকে তারা ‘মিসাইল সিটি’ বলে থাকে। এই কারণে লঞ্চারগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান তাদের মিসাইল ছোড়ার সক্ষমতা যথাসম্ভব অক্ষত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ উদ্দেশ্য মূলত দুটি। প্রথমত, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বজায় রাখা এবং দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ থামার পর মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ‘তারা এখনও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বে, কিন্তু আমরা সেগুলো ভূপাতিত করব। তারা ভূগর্ভে চলে যাবে, কিন্তু আমরা তাদের খুঁজে বের করব’।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশসীমায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও, গত শুক্রবার মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ইরানে ভূপাতিত হয় এবং যুদ্ধবিমানটির পাইলটকে উদ্ধারে মার্কিন বিশেষ বাহিনীকে ইরানে প্রবেশ করতে হয়। শুক্রবার বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর থেকে রোববার উদ্ধার হওয়ার আগপর্যন্ত দুদিন ওই মার্কিন কর্মকর্তাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।
যদিও ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছিল, নিখোঁজ ওই কর্মকর্তাকে ধরতে সহায়তা করলে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড বা ৬০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
এর আগে সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার পরও ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনও অক্ষত রয়েছে বলে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হাজার হাজার একমুখী হামলাকারী ড্রোনও তেহরানের হাতে রয়েছে।
সিএনএনকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের প্রায় ৫০ শতাংশ ড্রোন সক্ষমতা এখনও কার্যকর রয়েছে। একটি সূত্র বলেছে, ‘তারা (ইরান) এখনও পুরো অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মতো অবস্থানে রয়েছে’। এই হিসাবের মধ্যে এমন লঞ্চারও থাকতে পারে, যেগুলো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়েছে, কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশও অক্ষত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত উপকূলীয় সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য না করায় এগুলো টিকে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে ফেলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর