বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সরাসরি চাপ এসে পড়েছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে। ডিজেলের ঘাটতির কারণে ভরা মৌসুমেও শত শত মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। খেয়া নৌকা, ফিশিং বোট মালিক ও জেলেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত মাছ ধরা, ব্যাহত হচ্ছে নদীপথে পণ্য পরিবহন, আর কর্মহীন সময় কাটাচ্ছেন হাজারো জেলে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) কর্ণফুলী নদীর ফিশারি ঘাট, অভয়মিত্র ঘাট ও ব্রিজ ঘাট ঘুরে দেখা যায়—শত শত ট্রলার নোঙর করে রাখা। মালিক–মাঝিরা জানান, কয়েকদিন ধরে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় ট্রলারগুলো সাগরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে, আয় না থাকায় মালিকরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
নৌকার মাঝিরাও জানাচ্ছেন, বাজারে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়ে গেছে। তেল মিললেও মিলছে কম পরিমাণে।
মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি ট্রলারের জন্য ১–২ হাজার লিটার এবং বড় ট্রলারের জন্য ৩.৫–৪ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু এখন মিলছে মাত্র অর্ধেকেরও কম। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হলেও মিলছে না প্রয়োজনীয় সরবরাহ। ফলে সাগরে যাওয়া অনেকেই বন্ধ করে দিয়েছেন।
জেলা মৎস্য দফতর বলছে, মাছ ধরা কমেছে ৩০–৪০ শতাংশ। কিন্তু জেলে–ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তবে মাছ ধরা কমেছে অন্তত ৭০ শতাংশ।
বিডব্লিউটিসির হিসাবে, প্রতিদিন যে ৭০–৮০টি লাইটার জাহাজ বুকিং হয়, তাদের প্রয়োজন হয় গড়ে আড়াই লাখ লিটার ডিজেল। কিন্তু মেরিন ডিলারদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০–৭০ হাজার লিটার। তেল সংকটে নদীপথে মালবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
ফিশারি ঘাটের মাঝি নোমান বলেন,“তেল সংকট আর নিষেধাজ্ঞা—দুই মিলিয়ে আগেভাগেই ট্রলার বসিয়ে রেখেছি। ৫ লাখ টাকা খরচ করে সাগরে গিয়ে ৩ লাখ টাকার মাছ পেয়েছি। মালিক আর ঝুঁকি নিতে চান না।”
ট্রলার মাঝি মোহাম্মদ টিপু বলেন,“লোন নিয়ে সাগরে যাই। আগে যেখানে ৪০০–৫০০ লিটার তেল মিলত, এখন পাওয়া যায় মাত্র ২০০ লিটার। ২০–২৫ জন জেলে নিয়ে বসে আছি।”
ট্রলার মালিক শফিকুল ইসলাম বলেন,“সাগরে মাছ নেই, তেলও নেই—সব মিলিয়ে আগেই ট্রলার তুলে রেখেছি।”
এদিকে আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সমুদ্রে ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। সারাবছরে মোট ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকে। ফলে নির্দিষ্ট কয়েক মাসই জেলেদের আয়ের মৌসুম। এবারের জ্বালানি সংকট তাদের জীবন–জীবিকা আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
চট্টগ্রাম বোট মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসাইন বলেন,“তেলের সংকট আছে ঠিক, তবে বেশি দাম দিলে পাওয়া যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় অনেকেই আগেভাগে ফিরে এসেছে।”
চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দফতরের উপপরিচালক শওকত কবির চৌধুরী জানান, কয়েকজন জাহাজ মালিক মৌখিকভাবে অভিযোগ করলেও কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন,“নিষেধাজ্ঞা সামনে। এ সময় ট্রলার যাতে সাগরে না যায়, তাই ফিলিং স্টেশনগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হবে।”
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর