ময়মনসিংহের ভালুকায় মিল-ফ্যাক্টরির ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের লড়াই রোববার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গড়ায়, যেখানে বাবা-ছেলের মধ্যেই গুলির ঘটনা ঘটে এবং অন্তত তিনজন আহত হন।
স্থানীয়দের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতার পালাবদলই এ সহিংসতার মূল সূত্রপাত। মিল ফ্যাক্টরির ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই রোববার দুপুরে উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া নারিশ কারখানা এলাকায় বাবা-ছেলের মধ্যে মারামারি ও গুলির ঘটনা ঘটে।
মারামারি ও গুলির ঘটনায় ছেলের গুলিতে বাবাসহ উভয় পক্ষের তিনজন আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আহতরা হলেন খোকা মিয়া (৫৫), খোকন (৪৫) ও বখতিয়ার আহমেদ (৪৪)। এদের মধ্যে খোকা মিয়া (৫৫) ও তার সহযোগী খোকন (৪৫) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পরই ভালুকা মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই মডেল থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি।
জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১১ ভালুকা আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। অপরদিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে উপজেলা বিএনপির অপর অংশের নেতা, আহ্বায়ক (ভারপ্রাপ্ত) আলহাজ্ব মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচন চলাকালীন সময়েই, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দায়ে, আলহাজ্ব মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমকে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক (ভারপ্রাপ্ত) পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সময় একই অপরাধে তার অনুসারী উপজেলা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকেও বহিষ্কার করা হয়।
নির্বাচনে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু জয়লাভ করেন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার সমর্থিত নেতা-কর্মীরা উপজেলার বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরীতে মোর্শেদ আলমসহ তার গ্রুপের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঝুট ব্যবসা এমপি সমর্থিত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। রোববারের ঘটনাটিও ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামিরদিয়া গ্রামের উপজেলা বিএনপির সদস্য খোকা মিয়া বিএনপির দলীয় প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর পক্ষে ও তার ছেলে যুবদলকর্মী তোফায়েল আহমেদ রানা বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
নির্বাচনের পূর্বে স্থানীয় নারিশ ফ্যাক্টরির ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ছিল ছেলে যুবদলকর্মী তোফায়েল আহমেদ রানার নামে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ওই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বাবা খোকা মিয়ার নামে। এরপর থেকেই বাবা খোকা মিয়া বিভিন্ন লোক মারফত তার ছেলেকে এলাকা ছাড়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছিলেন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে খোকা মিয়ার কারণে বাড়ির সামনে নিজের অফিসে বসতে পারছিলেন না ছেলে তোফায়েল আহমেদ।
ঘটনার সময় তোফায়েল আহমেদ লোকজন নিয়ে অফিসে বসেন। এ সময় তার বাবা লোকজন নিয়ে অফিস বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে মারামারি এবং একাধিক রাউন্ড গুলির ঘটনা ঘটে।
এছাড়াও নির্বাচনের পর উপজেলার প্রায় বেশিরভাগ মিল ফ্যাক্টরির ঝুটের ব্যবসা এমপির সমর্থিত গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। যেকটি মিল-ফ্যাক্টরির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি, সেগুলোকে কেন্দ্র করেই ঘটছে এসব সহিংসতা। গত ১৬ মার্চ উপজেলা জামিরদিয়া এলাকার এস কিউ স্টেশনের "কালার মাস্টার" নামের প্রতিষ্ঠান থেকে মোর্শেদ আলমের লোকজন ওয়েস্টেজের মাল বের করার সময়, খোকা মিয়ার নেতৃত্বে বাধা দেওয়া হয়।
ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য ইব্রাহিম খলিল বাদী হয়ে গত ১৭ই মার্চ মোর্শেদ আলমসহ ৫০ জন বিএনপির নেতাকর্মীর নামে ভালুকা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সম্প্রতি একই এলাকায় রিদিশা স্পিনিং মিল থেকে মোর্শেদ আলমের লোকজন মাল বের করার সময় উল্লেখিত সংঘবদ্ধ গ্রুপ মিল গেটে উপস্থিত হয়ে বাঁধা দেয়।
আমতলী এলাকার "কটন গ্রুপে" ঝুটের ব্যবসা করতেন হবিরবাড়ি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আবু সাঈদ জুয়েল। সম্প্রতি এমপি বাচ্চু নিজে ওই মিল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আবু সাঈদ জুয়েলকে বাদ দিয়ে এমপির মনোনীত উপজেলা যুবলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি কামরুজ্জামান পিন্টুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সততা এন্টারপ্রাইজকে ওয়ার্ক অর্ডার প্রদান করেছেন। জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ির স্কয়ার ফ্যাশনের ওয়ার্ক অর্ডার ছিল, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) আলহাজ্ব শহিদুল ইসলামের নামে। এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু কারখানা কর্তৃপক্ষকে বার বার সুপারিশ ও বিভিন্ন হুমকি প্রদান করার ফলে, এমপির অনুকূলে ওয়ার্ক অর্ডার দিতে বাধ্য হন।
মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম জানান, "আমি গত ২৫ বছর থেকে অদ্যাবধি যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথেই ব্যবসায় জড়িত ছিলাম, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায়, তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর ক্ষিপ্ত হয়ে, সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরণের মালামাল সরবরাহ বা বের করতে চাইলে এমপি বাচ্চুর অনুসারী সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধ ভাবে মিল গেটে বাঁধা প্রদান করে আসছে।" এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু জানান, "আমি এসব ঘটনার সাথে জড়িত নই।"
তিনি বলেন, "কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে কারও ব্যবসায় বাধা ও হুমকি প্রদান করেন, তাহলে এমন কথার স্পষ্ট প্রমাণ দিতে বলবেন।" তিনি আরও বলেন, "আমি বা আমার পরিবারের কেউ এসব মিল ফ্যাক্টরির ঝুটের ব্যবসায় কখনো জড়িত নই।"
ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম গত ১৭ মার্চ তারিখে মোর্শেদ আলমের নামে রুজু হওয়া মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রোববারের ঘটনা সর্ম্পকে জানান, ঘটনার পর ভালুকা মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এ ঘটনায় এখনো কোনো পক্ষ থেকে লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর