গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ‘খাদ্যের ভাণ্ডার’ খ্যাত বিল বেলাইজুড়ে এখন উৎসবের রঙ। দিগন্তজোড়া মাঠের সবুজ ধান এখন তপ্ত রোদে সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে। ধান পেকে কাটার উপযোগী হওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফোটার কথা থাকলেও, একরাশ দুশ্চিন্তা ভর করেছে তাদের কপালে। মাঠের ফসল ঘরে তোলার একমাত্র নৌপথ ‘নলীখাল’ এখন কচুরিপানার নিশ্ছিদ্র চাদরে ঢাকা, যা কৃষকদের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বিষফোঁড়া।
প্রতি বছর বৈশাখ মাসে বিল বেলাইয়ের শত শত একর জমির ধান কেটে নৌকাযোগে বাড়িতে নিয়ে আসেন স্থানীয় কৃষকরা। দুর্গম বিলে যাতায়াত ও ধান পরিবহনের একমাত্র ভরসা হলো এই নৌকা। কিন্তু বিল থেকে ধান নিয়ে আসার প্রধান মাধ্যম নলীখাল এখন ঘন কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। কচুরিপানার জটলায় খালের পানি চলাচলের পথ এমনভাবে রুদ্ধ হয়ে আছে যে, সেখান দিয়ে একটি ছোট নৌকা চালানোও এখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।
মাঠে দাঁড়িয়ে পাকা ধানের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, “ধান তো আলহামদুলিল্লাহ ভালোই হইছে। এখন ধান কাটার সময়, কিন্তু আমাগো বুক কাঁপতাছে। ধান কাইটা নৌকায় কইরা বাড়িতে আনমু যে, সেই নলীখাল তো জঙ্গল (কচুরিপানা) হইয়া আছে। এক হাত নৌকা আগানোর উপায় নাই। নলীখাল দিয়া নৌকা না চললে এই হাজার হাজার মণ ধান আমরা কই নিয়া যামু?”
একই আশঙ্কার কথা জানালেন আরেক কৃষক আজমত হোসেন। তিনি বলেন, “বিলে ধান কাটার মৌসুম খুব অল্প সময়ের। মেঘ-বৃষ্টি শুরু হইলে বা জোয়ারের পানি আইলে সব ধান তলায়া যাইবো। গত বছর আমরা নিজেরা চাঁদা তুইলা কিছু পরিষ্কার করছিলাম, কিন্তু এবার কচুরিপানা এত বেশি যে আমাগো সাধ্যের বাইরে। সরকার থাইকা এই খালটা পরিষ্কার না কইরা দিলে আমাগো কপালে এবার না খাইয়া থাকা ছাড়া উপায় নাই।”
কৃষকদের তথ্যমতে, নলীখালের এই অচলাবস্থা নিরসন না হলে কেবল ধান পরিবহন ব্যাহত হবে না, বরং বৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে করে গোটা অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম কামরুল ইসলাম বলেন, “বিল বেলাইয়ের কৃষকদের সমস্যার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। নলীখালের কচুরিপানার কারণে ধান পরিবহনে যে বিঘ্ন ঘটছে, তা নিরসনে আমরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করব। স্থানীয় কৃষি অফিস ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে কীভাবে দ্রুততম সময়ে খালটি পরিষ্কার করে নৌপথ সচল করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।”
সোনালী ধানের এই মৌসুমে নলীখালের বাধা দূর হয়ে কৃষকের ঘামঝরা ফসল দ্রুত গোলায় উঠুক—এমনটাই এখন কালীগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর