পর্যটন নগরী কক্সবাজারে দেশের একমাত্র আইকনিক রেলস্টেশনটি উদ্বোধনের প্রায় আড়াই বছর পার করলেও এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি এর যাত্রীসেবার বেশিরভাগ সুবিধা। বাহ্যিক নান্দনিকতা ও স্থাপত্যে মুগ্ধতা থাকলেও বাস্তব সেবায় ঘাটতির কারণে হতাশা বাড়ছে যাত্রীদের মধ্যে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে স্টেশনটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম, ফলে সম্ভাব্য বিপুল রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে ঝিনুক আকৃতির নকশায় ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক রেলস্টেশনটি ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সঙ্গে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের সময় এটিকে দেশের ‘আইকনিক’ অবকাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও সময়ের ব্যবধানে সেই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্টেশনটির মূল ভবন ছয়তলা বিশিষ্ট এবং পরিকল্পনায় ছিল আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা- মসজিদ, শিশুযত্ন কেন্দ্র, বিনোদন জোন, শপিং মল, রেস্তোরাঁ, তারকামানের হোটেল, কনফারেন্স হল, চলন্ত সিঁড়ি, উন্নত ওয়েটিং স্পেসসহ নানা সুবিধা। কিন্তু উদ্বোধনের এতদিন পরও এসবের বেশিরভাগই যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের সম্মুখভাগে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারাটি এখন আংশিক অচল। চারপাশে দেওয়া বাঁশের ঘেরার অনেক অংশ ভেঙে গেছে, কোথাও কোথাও জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। আধুনিক স্থাপনার সঙ্গে এই অস্থায়ী ব্যবস্থা পুরো সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিয়েছে। ভেতরের চিত্রও খুব ভিন্ন নয়। স্ক্যানার, নির্দেশনা বোর্ড, চলন্ত সিঁড়ি- সবই রয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর ব্যবহার সীমিত বা বন্ধ। যাত্রীসেবার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
কুমিল্লা থেকে আসা যাত্রী শিহাব চৌধুরী বলেন, ভেতরের স্থাপনাগুলো দেখে ভালো লেগেছে, কিন্তু বাইরে এসে মনে হয়েছে পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। সামনে এলাকা যদি আরও সুন্দর করে সাজানো যেত, তাহলে পুরো স্টেশনটা অন্যরকম লাগত।
ঢাকা থেকে আগত হিল্লোল চক্রবর্তী বলেন, বাইরে থেকে স্টেশনটি দেখলে বিদেশি মানের মনে হয়। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখি অনেক কিছুই আছে, আবার ব্যবহার হচ্ছে না। চলন্ত সিঁড়ি বন্ধ, স্ক্যানার থাকলেও ব্যবহার কম- এসব দেখে হতাশ লাগে।
যাত্রী ফরহানা সুমীর অভিযোগ, একটি বড় স্টেশনের তুলনায় সুবিধা খুবই সীমিত। একটি মাত্র ওয়াশরুম দিয়ে ভবিষ্যতে যাত্রীদের চাহিদা পূরণ হবে না। ফার্মেসি, খাবারের দোকান, নামাজের জায়গা- এসবের অভাব স্পষ্ট।
যাত্রীদের মতে, স্টেশনটি আন্তর্জাতিক মানের করার মতো সব উপকরণ থাকলেও সেগুলো চালু না থাকায় সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগছে না।
স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার গোলাম রব্বানী জানান, পূর্ণাঙ্গ পরিচালনার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় পক্ষ দায়িত্ব নিলে পুরো ভবন একসঙ্গে চালু করা হবে। তখন যাত্রীরা সব ধরনের সুবিধা পাবেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) মো. সুবক্তগীন বলেন, অপারেশনাল কার্যক্রম ইতোমধ্যে চালু রয়েছে। যাত্রীদের জন্য মৌলিক সুবিধাগুলো দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালুর জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। জুনের মধ্যে শেষ করে জুলাইয়ের দিকে অপারেটর নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, স্টেশনে অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে সাময়িকভাবে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ স্থানকে আরও নান্দনিকভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্তমানে এই স্টেশন থেকে সপ্তাহে ছয় দিন ঢাকা-কক্সবাজার ও কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মতে, এটি দেশের অন্যতম লাভজনক রুট। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় বিনিয়োগের একটি প্রকল্প দীর্ঘদিন আংশিকভাবে চালু থাকা শুধু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর