হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় কাজের মেয়েকে ধর্ষণের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া তিন বছরের শিশু কন্যার পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে। অভিযুক্ত প্রভাবশালী গৃহকর্তা মুরশেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ডিএনএ পরীক্ষায় জন্ম নেওয়া কন্যা সন্তানের জৈবিক পিতা হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়েছে। তবে প্রভাবশালী মুনিব গৃহকর্তা এখনও সন্তানকে গ্রহণ করেননি এবং অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য বাদীনী স্বপ্না বেগম ও তাঁর পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা রকম পোস্ট দেখা যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কামারগাঁও গ্রামে। কাজের মেয়ে স্বপ্না বেগমকে (৩০) বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠে গৃহকর্তা প্রভাবশালী মাতব্বর মুরশেদ চৌধুরী (৫৫)-এর বিরুদ্ধে। তিনি মেয়েটিকে তাঁর গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে স্বপ্না একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। এ নিয়ে এলাকায় কয়েক দফা সালিশ সভা হলেও প্রভাবশালী মুরশেদ চৌধুরী সালিশ সভার রায় অমান্য করে কাজের মেয়েকে হুমকি দিয়ে এলাকাছাড়া করেন।
এরপর নির্যাতিত স্বপ্না বেগম ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত মুরশেদ আহমদ চৌধুরীকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন এবং শিশু কন্যার ডিএনএ টেস্ট করার আদেশ দেন।
হবিগঞ্জ পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের কামারগাঁও গ্রামের আশ^র্দ চৌধুরীর পুত্র মুরশেদ চৌধুরী মুর্শিদ-এর ঘরে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতেন করগাঁও ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের সামছু মিয়ার মেয়ে স্বপ্না বেগম। ফলে তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গৃহকর্তা মুরশেদ চৌধুরী বিভিন্ন সময়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। ভিকটিমের অসহায়ত্ব ও মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে অভিযুক্তের বাড়িতে কাজ করার সময় থেকেই ভিকটিমের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা একাধিকবার জোরপূর্বক শারীরিক নির্যাতনে গর্ভপাতে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ভিকটিম গর্ভবতী হলে এলাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং স্থানীয়দের সালিশ সভায় জিজ্ঞাসাবাদে ভিকটিম অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করেন। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর নবীগঞ্জের দীঘলবাক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ভিকটিম একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রেজিস্ট্রারে প্রথমে শিশুটির পিতার নাম হিসেবে অভিযুক্তের নাম লিপিবদ্ধ হলেও পরবর্তীতে তা কেটে দেওয়া হয় বলে তদন্তে জানা গেছে।
মামলার তদন্তে পিবিআই সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে এবং একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায়। এরপর অধিকতর নিশ্চিতের জন্য আদালতের অনুমতিক্রমে ভিকটিম, তার সন্তান এবং অভিযুক্তকে সশরীরে ঢাকার মালিবাগস্থ ফরেনসিক ল্যাবে উপস্থিত করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে সংগৃহীত নমুনাসমূহ সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হয়।
ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা হয় যে, হালিমা বেগম মুর্শিদা নামের ওই কন্যা সন্তানের জৈবিক পিতা অভিযুক্ত মুরশেদ আহম্মদ চৌধুরী মুর্শিদ (৫৫)। এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণসহ সাক্ষ্য, চিকিৎসা তথ্য ও অন্যান্য উপাত্ত বিশ্লেষণে পিবিআই অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভিকটিম পূর্বে বিবাহিত ছিলেন এবং বর্তমানে চরম অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি শুরু থেকেই ধর্ষণের অভিযোগ ও সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে আসছিলেন। তদন্তে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯(১) ধারায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি একই আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানের ভরণপোষণসহ আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
চলতি এপ্রিল মাসে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র পাল স্বাক্ষরিত এ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এরপর আসামীর ছেলে নবীগঞ্জ উপজেলা স্কুলের শিক্ষক জামিল আহমেদ চৌধুরী খোকন (৩০) ভিকটিমকে মামলা তুলে নেওয়ার নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে মুরশেদ আহমদ চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর ছেলে নবীগঞ্জ উপজেলা স্কুলের শিক্ষক জামিল আহমেদ চৌধুরী খোকন বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমার বাবাকে ফাঁসানো হয়েছে।”
কাজের মেয়ে স্বপ্না বেগম (৩০) বলেন, “আমাকে মুরশেদ চৌধুরী জোর করে বিয়ে করবেন বলে প্রায় দুই বছর ভোগ করেন। আমি তাকে বারবার বিয়ের জন্য চাপ দিলে তিনি বিয়ে করেননি। এখন আমাকে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, আমি আমার তিন বছরের শিশু সন্তানকে নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কে দিবে আমার শিশু হালিমা মুর্শিদার পিতৃ পরিচয়, কে দিবে আমার অসহায় জীবনের সমাধান।”
তদন্তকারী কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র পাল বলেন, “আমি দীর্ঘ এক বছর মামলাটি তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছি। অসহায় মহিলাকে প্রভাবশালী মুরশেদ চৌধুরীর ধর্ষণের প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে তাই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।”
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর