একের পর এক বিস্ফোরণ, বিধ্বংসী হামলা— যেন সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা। এমন এক ভূখণ্ড, যাকে দখল করতে গিয়ে সুলতান সুলেমান-এর মতো পরাক্রমশালী শাসকও শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননি— আজকের বাস্তবতা সেই ইতিহাসকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। তারা কখনো সহজে হার মানেনি, হার মানতে শেখেওনি। হ্যাঁ, কথাটা ইরান-কে নিয়েই।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি হাজার বছরের সভ্যতা ও ইতিহাসের ধারক। একসময় এটি ছিল শক্তিশালী পারস্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্র। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬শ শতকে উসমানীয় সাম্রাজ্য-এর নেতৃত্বে সুলতান সুলেমান ইরানের দিকে ধারাবাহিক অভিযান চালান। বাগদাদসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করা সম্ভব হলেও পুরো ইরান কখনোই তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এর পেছনে ছিল কৌশলগত পরিবর্তন। সরাসরি যুদ্ধের বদলে ইরান বেছে নেয় ভিন্নধর্মী পদ্ধতি— কখনো পিছু হটা, হঠাৎ আঘাত হানা, আবার দ্রুত সরে যাওয়া। এই ধরনের গেরিলা কৌশলই ধীরে ধীরে শক্তিশালী বাহিনীর অগ্রগতি থামিয়ে দেয়।
ইরানের এই অদম্য মানসিকতার পেছনে ধর্মীয় ও আদর্শিক প্রভাবও গভীরভাবে কাজ করে। হযরত আলী (রা.)— যিনি সাহস, ন্যায়বিচার ও দৃঢ়তার প্রতীক— তার আদর্শ অনুসরণ করেন দেশটির অধিকাংশ শিয়া মুসলিম। তারা তাকে ইসলামের প্রথম বৈধ ইমাম হিসেবে মানেন।
শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নেতৃত্ব কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আধ্যাত্মিক দায়িত্বও বহন করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আলী (রা.) এবং তার বংশধরদের সত্য ও ন্যায়ের পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখা হয়।
এই বিশ্বাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিফলন পাওয়া যায় কারবালার যুদ্ধ-এ। সেখানে ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আত্মত্যাগ করেন। এই ঘটনা শিয়া চেতনায় গড়ে তোলে এক দৃঢ় মনোভাব— অন্যায়ের সামনে নত না হওয়া, কষ্ট সহ্য করা এবং শেষ পর্যন্ত অবিচল থাকা।
এই মানসিকতার বড় পরীক্ষা হয়েছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধ-এ। টানা আট বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি সত্ত্বেও ইরান ভেঙে পড়েনি। বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তারা আরও শক্তভাবে বিশ্বাস করতে শিখেছে— টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
বর্তমান বাস্তবতায় ইরান শুধু নিজের ভেতরেই শক্তিশালী হয়নি, বরং বদলে দিয়েছে যুদ্ধের কৌশল। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র মনে করত দূরবর্তী দেশে যুদ্ধ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা সম্ভব, নিজেদের ওপর চাপ কম রেখেই। কিন্তু সেই ধারণা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।
ইরানের কৌশল শুধু সরাসরি যুদ্ধ নয়। ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, দূরনিয়ন্ত্রিত হামলা এবং আঞ্চলিক মিত্রবলয়ের মাধ্যমে তারা এমন এক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে ইরানকে আঘাত করা মানেই একটি বিস্তৃত প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— ইরান এই সংঘাতের খরচ একা বহন করে না। তাদের প্রতিক্রিয়া এমনভাবে পরিকল্পিত, যাতে যুক্তরাষ্ট্র-এর মিত্ররাও এর প্রভাব অনুভব করে। উপসাগরীয় অঞ্চল, সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ— সবই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ফলে সংঘাত আর কেবল দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
এই বাস্তবতা নতুন নয়। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান সরাসরি আল-আসাদ ঘাঁটি-তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়— ইরান শুধু প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে থাকে না, প্রয়োজন হলে সরাসরি আঘাত হানতেও প্রস্তুত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে যুদ্ধের অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বিপুল ব্যয়ে সামরিক শক্তি গড়ে তোলে, সেখানে ইরান বেছে নিয়েছে ভিন্ন কৌশল— কম খরচে আঘাত হানা এবং প্রতিপক্ষকে বাধ্য করা ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে। অর্থাৎ, তুলনামূলকভাবে সস্তা আক্রমণ ঠেকাতে প্রতিপক্ষকে ব্যবহার করতে হয় অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রযুক্তি। আর এখানেই বদলে গেছে আধুনিক যুদ্ধের হিসাব।
সূত্রঃ আরটিভি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
অন্যান্য... এর সর্বশেষ খবর