বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা, দাবানল, অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে আবারও সক্রিয় হতে যাচ্ছে জলবায়ুর চরম আবহাওয়াগত ঘটনা ‘এল নিনো’। এর প্রভাবে আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ আবহাওয়াগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের আবহাওয়া বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)।
মঙ্গলবার (২ জুন) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডব্লিউএমও জানায়, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ। আর নভেম্বরের মধ্যে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে ৯০ শতাংশ।
এ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক ভিডিওবার্তায় বলেন, “আগামী মাসগুলোতে ৯০ শতাংশ নিশ্চিততা নিয়ে এল নিনো আমাদের দোরগোড়ায় উপস্থিত হচ্ছে। বিশ্ববাসীর উচিত এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা।”
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির অস্বাভাবিক বিস্তারের ফলে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেয় এবং নয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর কারণে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকা, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে তীব্র খরার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী হ্যারিকেন ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মতে, এবারের এল নিনো মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার হতে পারে এবং এর প্রভাব দ্রুত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে জলবায়ু, কৃষি ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
বিশ্ব যখন ইতোমধ্যেই নানা ভূরাজনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে, তখন সম্ভাব্য এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইতিহাসে নজর দিলে দেখা যায়, ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে সংঘটিত এক শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র কারণে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভয়াবহ খরা ও ফসলহানি দেখা দিয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হওয়া মহাদুর্ভিক্ষে বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্ভাব্য ২০২৬ সালের এল নিনো সেই ভয়াবহ ইতিহাসের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় আরও বেশি উদ্বেগজনক। কারণ, শিল্পায়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে গত দেড়শ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সাল ছিল রেকর্ড করা ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ বছর।
বিজ্ঞানীদের মতে, ইতোমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে যদি শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হয়, তাহলে খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ফলে বিশ্বকে এখন থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব চেলেস্তে সাউলো এ ব্যাপারে বলেন, এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া বিগত এল নিনো পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সেই চরম আবহাওয়ার কারণেই ২০২৪ সালকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল।
তিনি আরও সতর্ক করেন, তীব্র তাপদাহ ও খরার পাশাপাশি মশা ও অন্যান্য বাহকনির্ভর রোগের বিস্তার বাড়তে পারে। একইসঙ্গে, কমে যেতে পারে খাদ্য ও পানির সরবরাহ। ফলে সংকটে থাকা দরিদ্র দেশগুলোতে দেখা দিতে পারে চরম বিপর্যয়।
সূত্রঃ আল-জাজিরা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর