ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) মীর মুগ্ধ সরোবর এলাকায় আপত্তিকর অবস্থায় থাকা দুই বহিরাগতকে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়েছে। গতকাল (২২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস সংলগ্ন থানা গেট এলাকায় তাদেরকে মারধর করেন স্থানীয় বহিরাগতরা। এতে জাহাঙ্গীরনগর (জাবি) ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
হামলায় ইবি শিক্ষার্থী তরুণ বিশ্বাসের নাক, কান ও চোখের নিচে গুরুতর জখম হয় এবং তার একটি দাঁত ভেঙে যায়। জাবির শিক্ষার্থী লিখনও আহত হন। পরে তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেল ৪টা নাগাদ সরোবর এলাকায় এক যুগলকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান ইবি চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী তরুণ বিশ্বাস, জাহিন আফিফা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) থেকে বেড়াতে আসা শিক্ষার্থী লিখন। এ সময় ওই যুগলের কাছে পরিচয় জানতে চাইলে তারা স্থানীয় কয়েকজনকে ফোন করে ডেকে আনেন। পরে ৫ থেকে ৬টি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন স্থানীয় যুবকসহ আরেক জোড়া যুগল ঘটনাস্থলে জড়ো হয়।
খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। এ সময় ক্যাম্পাসের সিকিউরিটি সেলের সদস্য আরশাদ বহিরাগতদের লাঠিচার্জ করে দ্রুত ক্যাম্পাস ত্যাগের নির্দেশ দেন। এ ঘটনার জের ধরেই পরবর্তীতে হামলার ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সন্ধ্যায় জাবি শিক্ষার্থী লিখনের মোটরসাইকেল নষ্ট হয়ে গেলে তা মেরামতের জন্য তিনি ইবি শিক্ষার্থী তরুণ ও ঐশীকে নিয়ে ক্যাম্পাস সংলগ্ন শেখপাড়া বাজারে যান। পরে সেখান থেকে ভ্যানে করে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে থানা গেট এলাকায় ১০ থেকে ১২ জন স্থানীয় যুবক তাদের গতিরোধ করে।
কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হামলাকারীরা শিক্ষার্থীদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও কিল-ঘুষি মারতে শুরু করে। এতে ইবি শিক্ষার্থী তরুণ বিশ্বাসের নাক, কান ও চোখের নিচে গুরুতর জখম হয় এবং তার একটি দাঁত ভেঙে যায়। এ সময় জাবির শিক্ষার্থী লিখনও আহত হন। পরে আহতদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হামলায় ইবি শিক্ষার্থী তরুণ বিশ্বাসের নাক, কান ও চোখের নিচে গুরুতর জখম হয় এবং তার একটি দাঁত ভেঙে যায়। এ সময় জাবির শিক্ষার্থী লিখনও আহত হন। খবর পেয়ে প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্য ও ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী তরুণ বিশ্বাস বলেন, “আমাদের ওপর আগে থেকেই নজর রাখা হচ্ছিল। শেখপাড়া থেকে ফেরার পথে হঠাৎ ১০-১২ জন মিলে আমাদের ওপর আক্রমণ করে। তাদের হাতে ইট জাতীয় কিছু ছিল। আমার একটি দাঁত ভেঙে গেছে এবং নাকে মারাত্মক আঘাত পেয়েছি।”
এ ঘটনায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইবি চারুকলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, তিনজন শিক্ষার্থী ওই যুগলকে কিছুটা আপত্তিকর অবস্থায় দেখে তাদের নানাভাবে হেনস্তা করেন। এমনকি জাবি শিক্ষার্থী লিখন ওই সময় তাদের র্যাগ দেন। পরে ওই যুগল আরেকটি পরিচিত কাপলকে ডেকে আনেন। পরে তাদেরকেও হেনস্তা করা হয়। এসময় দুই মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে ওই যুগলের এক সদস্য স্থানীয়দের ফোন করলে ৫-৬টি মোটরসাইকেলে কয়েকজন ঘটনাস্থলে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শিক্ষার্থীরা প্রক্টর এবং নিজেদের সহপাঠীদের বিষয়টি জানান। পরে ২০-৩০ জন শিক্ষার্থী জড়ো হন। এসময় প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্য আরশাদ কয়েকজন বহিরাগতকে লাঠি দিয়ে মারধর করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এরপর মেয়ে দুজন কান্না করতে করতে স্থান ত্যাগ করেন।
তিনি আরও জানান, পরে সন্ধ্যার দিকে জসীম মামার দোকানের সামনে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই সময় লিখনকে লক্ষ্য করে বহিরাগতরা তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এ ঘটনায় আফিফ হোসেন নামে এক সিনিয়র শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বাহিরে যেতে নিষেধ করেন এবং লিখনকে ক্যাম্পাস ত্যাগের পরামর্শ দেন।
পরে জাবি শিক্ষার্থী লিখন ইবি শিক্ষার্থী তরুণ ও ঐশীকে নিয়ে শেখপাড়া বাজারে গেলে তারা হামলার শিকার হন। তবে হামলার সময় লিখন দৌড়ে সরে যাওয়ায় তিনি বড় ধরনের আঘাত পাননি। পরে তরুণ একা পড়ে গেলে তাকে মারধর করা হয়।
এদিকে তরুণের নাকের হাড় ভেঙেছে কি-না তা নিশ্চিত করতে রাত ৮টার দিকে তাদের কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে রাত সাড়ে ১১টার দিকে এক্স-রে রিপোর্টে বড় ধরনের হাড়ের ফাটল ধরা না পড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) চারুকলার ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী লিখন বলেন, “আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ইবি চারুকলার কয়েকজনের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয় আছে। তাদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাস ঘুরছিলাম।”
তিনি আরও বলেন, “লেকপাড়ে গেলে স্কুলপড়ুয়া এক কাপলকে কিছুটা আপত্তিকর অবস্থায় দেখি। পরে বিষয়টি তরুণ ও তার বন্ধুরা প্রক্টরকে জানান। এরপর ওই যুগলও স্থানীয় কিশোরদের ডেকে আনে। পরে প্রক্টরিয়াল বডি এসে পরিস্থিতি মীমাংসা করে।এরপর আমার বাইক নষ্ট হলে তরুণ ও ঐশীকে নিয়ে শেখপাড়ায় যাই। ফেরার পথে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়।”
র্যাগিংয়ের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি বাইরের শিক্ষার্থী। আমি কেন এসব করবো! পরিচয় জানানো বা প্রক্টরকে ফোন দেওয়া তরুণ ও জাহিন আফিফাই করছিল।”
এদিকে ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দোষীদের শনাক্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সংশ্লিষ্টরা রাতেই থানায় অবস্থান করেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। থানা সূত্রে জানা যায়, শনাক্তের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, “ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর