২৫ মার্চ রাত প্রায় দুইটা। কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের থোয়াইংগাকাটা বাজারে আব্দুল হক সওদাগরের চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন হাতির ডেবা এলাকার দুই বাসিন্দা, প্রতিবন্ধী বাবুল ও রমজান আলী। হঠাৎ একটি সরকারি গাড়ি এসে থামে দোকানের সামনে। নামেন রাজারকুল রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. অভিউজ্জামান এবং আপাররেজু বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ওই দুই যুবককে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই দর-কষাকষি শেষে জনপ্রতি আট হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রামু ও উখিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলজুড়ে এমন অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী এলাকার মানুষ। আর এই ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে দুটি নাম: ৪১তম বিসিএসের দুই সহকারী বন সংরক্ষক মো. অভিউজ্জামান এবং মো. শাহিনুর ইসলাম।
২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর একই দিনে দুজন যোগ দেন দুটি রেঞ্জে। অভিউজ্জামান কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের রামুর রাজারকুল রেঞ্জে এবং শাহিনুর ইসলাম উখিয়া রেঞ্জে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারা বনের জমিতে বসবাসকারী প্রায় ৫০টি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। অন্যান্য বসতবাড়িতেও অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন। এতে ভয় পান স্থানীয়রা। আর সেই ভয়কেই পুঁজি করে শুরু হয় কারবার। কাঁচা ঘরের জন্য সর্বনিম্ন ৫০ হাজার, সেমিপাকা ঘরের জন্য এক লাখ টাকা চাঁদা। যাদের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তাদের পুনরায় সংযোগ পেতে লাগত মোটা অঙ্কের নগদ টাকা। উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া, টাকা পেলে উচ্ছেদ না করা—এই ছিল পদ্ধতি।
গত বছরের ১৮ জুন দুজনেই ছয় মাসের প্রশিক্ষণে যান। ফিরে আসেন ১৮ ডিসেম্বর। সহকর্মীদের ভাষ্য, প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে তারা হয়ে ওঠেন আরও বেপরোয়া।
এই দুই কর্মকর্তার ব্যাচমেট আরেক সহকারী বন সংরক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিসিএস দিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছি সবেমাত্র। আমরা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শিখছি। অথচ অভি আর শাহিনুর মেতেছে টাকা আয়ে। এদের কোনো ভয়ডর নেই।”
তার দাবি, ওই দুজন চাকরির প্রথম বছরেই নানা উপায়ে দুই কোটি টাকার ওপরে হাতিয়ে নিয়েছেন। এ নিয়ে তারা গর্বও করেন।
শুধু সহকর্মীদের কাছ থেকে নয়, স্থানীয় বাসিন্দা, পান চাষি, টমটম চালক, কাঠুরিয়া—সবার মুখেই একই অভিযোগ। এমনকি বিভাগীয় কর্তৃপক্ষও এখন নড়েচড়ে বসেছে।
রামুর রাজারকুল রেঞ্জে অভিউজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে জিম্মি করে ঘর বানানোর অনুমতি বিক্রি, পানের বরজ ও চাষাবাদের জন্য নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়, কাঠ পাচারে গোপন সহযোগিতা—এসব অভিযোগ এখন দপ্তরের নথিতেও।
আপাররেজু বনবিট এলাকার থোয়াইংগাকাটা জামে মসজিদের পূর্ব পাশে আব্দুল হামিদ মনুকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার অনুমতি দিয়েছেন অভিউজ্জামান—এমন অভিযোগ করেছেন রামুর একাধিক বাসিন্দা। তাদের দাবি, এই টাকার লেনদেন হয়েছে আপাররেজু বনবিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদের মাধ্যমে।
এছাড়া ‘ভ্যালিজার’ নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ হেক্টর পর্যন্ত বনভূমি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি মাসের শুরুতে এসব ভ্যালিজারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের কাজ করেন মোজাফফর নামে এক ব্যক্তি, সঙ্গে থাকেন ফরেস্ট গার্ডরাও।
সদর, রামু ও ঈদগাঁওয়ের ফার্নিচার দোকান মালিকদের সঙ্গে মাসিক চুক্তি করেছেন অভিউজ্জামান—এমন অভিযোগও রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন ঈদগাঁওয়ের ফার্নিচার ব্যবসায়ী নুরুচ্ছফাসহ আরও দুজন। তাদের প্রত্যেকে মাসে ৪০ হাজার টাকা করে দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টমটম আটকে মুক্তিপণ:
গত ১১ মার্চ দুপুরে খুনিয়াপালংয়ের মির্জা আলীর দোকান এলাকার জমিরউদ্দিন নামের এক টমটম চালককে পূর্ব ধেচুয়াপালং বানিয়া দোকান স্টেশন এলাকা থেকে জোরপূর্বক রাজারকুল রেঞ্জ অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। টমটমটি ৯ দিন আটকে রেখে ১৬ হাজার টাকা আদায় করে তবেই ছাড়া হয়।
থোয়াইংগাকাটা ঘুটাবনিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ প্রতিবেদককে বলেন, “আমার টমটম গাড়ি স'মিলের সামনে থেকে চালক ও চাবি ছাড়া জোরপূর্বক রেঞ্জ অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এক সপ্তাহ পর বন কর্মচারী ইমরান ও চালক কলিমউল্লাহর মাধ্যমে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে গাড়ি ছাড়িয়ে আনি।”
উখিয়ায় শাহিনুরের কায়দা ভিন্ন, ফল একই:
উখিয়া রেঞ্জে শাহিনুর ইসলামের কায়দা কিছুটা ভিন্ন হলেও ফলাফল একই। গত ১১ এপ্রিল দিবাগত রাত দুইটায় রাজারপালং ইউনিয়নের হাতিমুড়া থেকে আব্দু শুক্কুরের মালিকানাধীন মাটিভর্তি একটি ডাম্পার আটক করেন শাহিনুর। পরে ফরেস্ট গার্ড জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে সেই গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার ভিডিও এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
একইভাবে গত ১৪ জানুয়ারি রাজারকুল ও উখিয়া রেঞ্জের যৌথ অভিযানে রামুর খুনিয়াপালং থেকে সাইফুল ইসলামের একটি ডাম্পার জব্দ করা হয়। পরে তিন ধাপে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা আদায় করে সেটি ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কুতুপালং বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাঁটাতারের লাগোয়া বন বিভাগের জমিতে হাজি নুরুল হকের বহুতল ভবন নির্মাণের ঘটনায়ও শাহিনুরের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ আছে, প্রথমে লোক দেখানো অভিযান, পরে নোটিশ-বাণিজ্যের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়েছে। ভবনটি এখনো নির্মাণাধীন, কোনো কার্যকর অভিযান নেই।
বনভূমি বিক্রির মহোৎসব:
এক সপ্তাহ ধরে উখিয়া ও রামুর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড় কাটা ও ভবন নির্মাণ চলছে রীতিমতো উৎসবের মেজাজে। উখিয়ার ছনখোলা, শেয়ালিয়া পাড়া, থ্যাংখালি তেলখেলা, বালুখালী, জুমরছড়া, কুতুপালং স্বর্ণপাহাড়, দোছরি, হরিণমারা থেকে শুরু করে রামুর পাঞ্জেখানা, ছাগলিয়াকাটা, পাইনবাগান, টংগাডেবা, কালার পাড়া—সর্বত্র একই চিত্র। স্থানীয়দের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও বসতবাড়ি তুলছেন সংরক্ষিত বনভূমিতে।
উখিয়ার রত্নাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং স্বর্ণপাহাড় এলাকায় তিন লাখ টাকার বিনিময়ে সংরক্ষিত বনে অট্টালিকা নির্মাণে সহায়তা করা হয়েছে বলে উখিয়া রেঞ্জের এক কর্মচারী জানিয়েছেন।
রাতের অন্ধকারে পাচার হচ্ছে কাঠ, মাটি ও তৈরি ফার্নিচার। অথচ একই সময়ে ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন টমটম চালক ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী কাঠুরিয়ারা। যারা টাকা দিচ্ছেন, তারা নিরাপদ। যারা গরিব, তারাই শিকার।
সমস্ত অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন দুই কর্মকর্তাই। মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, “উখিয়ার অধিকাংশ এলাকাই বনভূমি, যার ওপর রয়েছে রোহিঙ্গা বসতির চাপ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে জনবল অত্যন্ত সীমিত। আমার অধীনে মাত্র ২২ জন স্টাফ কাজ করেন। সেই হিসাবে প্রতি এক হাজার একর বনভূমি পাহারায় আছেন মাত্র একজন করে কর্মী, আর প্রায় দেড় লাখ মানুষের নিরাপত্তা ও বন রক্ষার দায়িত্বও পড়ছে একজন স্টাফের ওপর। এ কারণেই বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজারকুল রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. অভিউজ্জামান। টমটম আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, “দুটি টমটম আটক করা হয়েছিল ঠিকই। তবে একটি সাংবাদিকদের অনুরোধে এবং অপরটি একজন সেনা কর্মকর্তার জিম্মানামায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। টাকার বিনিময়ে নয়।”
ডাম্পারের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সেটির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বনের জমিতে অবৈধ বসতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার রেঞ্জে দুটি ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে খুনিয়াপালং ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি মানুষ বনের জমিতে বাস করে। আমি তো আর সবাইকে এখানে আনিনি। যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত আট থেকে দশটি অবৈধ ঘর ভেঙে দিয়েছি।”
পানের বরজ ও করাতকল মালিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, “এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বীকার করেছেন, অভিউজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার প্রধান টেকনাফের সহকারী বন সংরক্ষক।
শাহিনুরের বিষয়ে তিনি বলেন, “লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে নানাভাবে কিছু তথ্য কানে এসেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করছি।”
কুতুপালংয়ের বহুতল ভবন বিষয়ে তিনি বলেন, “মামলা করা হয়েছে, ভাঙার অনুমতিও চাওয়া হয়েছে। তবে দুই তলা পর্যন্ত কীভাবে নির্মিত হলো—এর সঙ্গে বন বিভাগের কে বা কারা জড়িত, তা তদন্ত করা হবে।”
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর