গরুর বাজারে চাঁদাবাজি করতে যাওয়া একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করায় উল্টো প্রতিবাদকারী যুবদল নেতার দলীয় পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী যুবদল নেতার নাম সরওয়ার সিকদার। তিনি কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা যুবদলের সদস্য। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, সংঘবদ্ধ একটি চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ায় তাকে দলীয়ভাবে টার্গেট করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ওসমান সরওয়ার সিকদার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির ঈদে বান্দরবান জেলার ঘুমধুম সংলগ্ন একটি গরুর বাজারে চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে উখিয়া থেকে একদল লোকজন যায়। এসময় উখিয়া উপজেলা যুবদলের আহবায়ক সাইফুল সিকদার, রাজাপালং ইউনিয়ন সাংগঠনিক দক্ষিণ শাখার কৃষকদলের সভাপতি মোহাম্মদ আলীসহ ৪০ থেকে ৫০ জন বাজারটিতে এসে ত্রাস সৃষ্টি করে চাঁদা দাবি করে।
অভিযোগ রয়েছে, বাজারে গিয়ে ওই প্রভাবশালী চক্র পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং টাকা না দিলে বাজারের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। বাজারটির শেয়ারধারী হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ওসমান সরওয়ার। এ সময় সরওয়ার ওই চক্রের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে ঘটনাটি তুলে ধরেন এবং অভিযুক্তদের নাম ও তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করেন। পরে বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় লোকজন একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ জানালে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সরওয়ারের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। একারণে গত ২ জুন কক্সবাজার জেলা যুবদলের প্যাডে দপ্তর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মিয়াজির স্বাক্ষরিত এক আদেশে সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক জিসানের নির্দেশে তাকে যুবদলের সকল পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে ওই আদেশে তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তার অপরাধ উল্লেখ করা হয়নি।
ওসমান সরওয়ার সিকদার দীর্ঘদিন ধরে পালংখালী ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক, পরে একই ইউনিয়নের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব এবং থানা যুবদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
বহিষ্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলেছি, লাইভ করেছি এবং যারা বাজারে চাঁদা তুলতে এসেছিল তাদের পরিচয় তুলে ধরেছি। এর প্রতিশোধ হিসেবেই আমাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই বহিষ্কার করা হয়েছে। যদি দল আমাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দিত, তাহলে আমি সব তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারতাম।'
তিনি আরও বলেন, '৫ আগস্টের পর থেকে কিছু ব্যক্তি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে এমন সব কর্মকাণ্ড করছে, যা দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে জনগণের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা অনেক এলাকায় জামানত হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।'
এদিকে গরুর বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগে নাম আসা সাইফুল সিকদার এর আগেও একটি সিএনজি সমিতিতে চাঁদা দাবির অভিযোগে দলীয় শাস্তির মুখে পড়েছিলেন। সে সময় তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা একটি বেপরোয়া সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে অভিযুক্ত এই চক্রের কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ চরমভাবে অতিষ্ঠ। অনেকের ভাষ্য, শীর্ষ কয়েকজন নেতার আশ্রয়ে থাকা প্রভাবশালী এই গোষ্ঠীর কারণে উখিয়ার লাখো মানুষ এক ধরনের জিম্মি অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উল্টো যারা প্রতিবাদ করছেন, তারাই হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পালংখালী ইউনিয়নের এক যুবদল নেতা বলেন, 'চাঁদাবাজির অভিযোগে যাদের নাম এসেছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কোনো তদন্ত ছাড়াই একজন প্রতিবাদকারী নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।'
আরেক বিএনপি নেতা বলেন, 'দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি বাজারে গিয়ে চাঁদা দাবি করে, সেটা অবশ্যই তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগকারীর মুখ বন্ধ করতে তাকে শাস্তি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে না।'
স্থানীয় এক যুবদল কর্মী বলেন, 'ওসমান সরওয়ারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তিনি যেটা করেছেন সেটা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চাঁদা দাবি করার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?'
এ বিষয়ে জানতে জেলা যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ উজ্জ্বল ও সাধারণ সম্পাদক জিসানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা দলীয় কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে উখিয়া ও পালংখালী এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং বহিষ্কারের পেছনের কারণ দুটিই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আনা হোক, যাতে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর