কুমিল্লায় দুর্বৃত্তদের হাতে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী খুনের ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, ডিবি, সিআইডি, পিবিআইসহ অন্যান্য সংস্থা ছায়া তদন্ত করছে। এ ঘটনায় শনিবার রাতে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন নিহত বুলেট বৈরাগীর মা নীলিমা বৈরাগী। রোববার দুপুরে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা। নিহত বুলেটের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ডুমুরিয়া বাবুপাড়ায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিবিআই কুমিল্লার একজন পরিদর্শক বলেন, এরই মধ্যে বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তির মোবাইল, ভিসা কার্ড ও মোবাইল বিকাশসহ তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চলছে।
এদিকে, রোববার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স কুমিল্লার নগরীর ধর্মসাগর পাড়ের পার্ক রোডের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ের সামনে আনা হয়। এ সময় বুলেট বৈরাগীর বাবা-মা ও স্ত্রী উর্মী হিরার কান্না আর আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অফিসের সহপাঠীরা তাদের সমবেদনা জানান। পরে কাস্টমস কমিশনার আবদুল মান্নান সরদার ও অন্যান্যরা মরদেহের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর মরদেহ গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ডুমুরিয়া বাবুপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
কাস্টমস কমিশনার বলেন, ঘটনা জানার পর থেকে পুলিশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনা তদন্ত করছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সহকর্মীর এ অকাল মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত। কাস্টমস বিভাগ সব সময় বুলেটের পরিবারের পাশে থাকবে।
এর আগে, গত শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি এলাকায় চট্টগ্রামমুখী লেনে আইরিশ হোটেলের পাশের রাস্তা থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশ। নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা। কুমিল্লা কাস্টমসের বিবির বাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরীর রাজাগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ভুঁইয়া হেরিটেজ নামের ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার মেয়ে উর্মির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের অভয় বৈরাগী নামের এক বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বুলেট বৈরাগী ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেড় বছর আগে তার চাকরি হয়। গত ১১ এপ্রিল বিভাগীয় সরকারি প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে যান। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে বাসে উঠেন। তার কুমিল্লায় বাসায় ফেরার কথা ছিল। যাত্রাপথে স্ত্রী ও মায়ের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কথা হয়।
নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী জানান, বুলেট বৈরাগী তার একমাত্র ছেলে। ওই রাতে সর্বশেষ রাত ২টা ২৫ মিনিটের দিকে ছেলে ফোন করে জানায়, কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছে সে। পরে রাত আড়াইটার পর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা কয়েকবার কথা বলেন। এরপর থেকেই ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাতভর সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো হদিস না পেয়ে শনিবার সকালে তার বাবা সুশীল বৈরাগী কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এর পরই তার মরদেহ পাওয়ার খবর আসে।
বুলেট বৈরাগীর বাবা সুশীল বৈরাগী বলেন, কত স্বপ্ন ছিল ছেলেটার। চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় ভাড়া বাসায় উঠেছিলাম। আজ বুকের ধন বুলেটের মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ডুমুরিয়া বাবুপাড়ায় ফিরে যাচ্ছি। সেখানে তার শেষকৃত্য হবে।
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। শনিবার রাতে নিহত ব্যক্তির মা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিট সম্মিলিতভাবে ঘটনার তদন্ত করছে। আশা করি, কম সময়েই রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর