• ঢাকা
  • ঢাকা, শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৬ মিনিট পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০২ মে, ২০২৬, ০৩:১৬ দুপুর

বৃষ্টি নিয়ে গেছে লবণ, দেনা নিয়ে গেছে ঘুম

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

মৌসুমের শেষ লগ্নে এসে যখন রেকর্ড উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছিলেন কক্সবাজার উপকূলের লবণচাষিরা, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে নামল বিপদ। ঝড়ো হাওয়া আর মুষলধারে বৃষ্টিতে মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে গেল হাজার হাজার একর লবণমাঠ। একদিকে প্রকৃতির রোষ, অন্যদিকে বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব- দুই দিক থেকে চাপে পড়ে কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন উপকূলের প্রায় ৪২ হাজার চাষি।

তীব্র দাবদাহের সুযোগে কক্সবাজার উপকূলে লবণ উৎপাদন রীতিমতো রেকর্ড ছুঁয়েছিল। দৈনিক উৎপাদন ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে লাফিয়ে উঠেছিল ৩২ হাজার মেট্রিক টনে। কিন্তু সেই উজ্জ্বল মুহূর্তকে ম্লান করে দিল কালবৈশাখীর দুই দফা আঘাত। বৈশাখের শুরুতে একবার, তারপর মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাতে প্রবল বর্ষণ- এই তিন দফা ধাক্কায় শতভাগ লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।

কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের মাইজপাড়ার চাষি কবির আহমদ এ বছর ১২ একর জমিতে লবণ চাষ করেছিলেন। মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে তার প্রায় দেড় হাজার মণ লবণ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বড় লোকসানের মুখে পড়েছি।

টেকনাফের সাবরাং এলাকার চাষি আলী আহমদের আক্ষেপ আরও তীব্র। ঋণ করে মাঠ নিয়েছিলেন। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ঋণ করে মাঠ নিয়েছি, কালবৈশাখীতে সব শেষ! এখন কীভাবে ঋণ শোধ করব বুঝতে পারছি না।

টেকনাফের নোয়াপাড়ার চাষি গিয়াস উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে খালের দুই পাশের ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে উৎপাদন থেমে গেছে। শাহপরীর দ্বীপের নুরুল ইসলাম বলেন, রাতদিন পরিশ্রম করে বেশি লাভের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশো মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে।

কুতুবদিয়ার চাষি শহীদুল ইসলামের হিসাব আরও কঠিন। হাতে বাকি মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন। একবার বৃষ্টি হলে ৭ থেকে ৮ দিন উৎপাদন বন্ধ থাকে। তাই অনেক চাষিই এখন আর মাঠে নামতে চাইছেন না।

বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে) কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, সদর এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মোট ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ মেট্রিক টন, যা গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন কম।

চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। গত সাড়ে পাঁচ মাসে উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন। দেশে লবণের মোট চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।

বিসিকের কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, বৃষ্টির কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। দৈনিক গড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ধরলে এই ১২ দিনে কম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে মাঠ ও কারখানা পর্যায়ে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ১০ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে।

মৌসুমের শুরু থেকেই ছিল বিপদ শুধু কালবৈশাখীর আঘাতই নয়, মৌসুমের শুরু থেকেই প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন চাষিরা।

লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দীন জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে মাঠে নামতে ২০ থেকে ২৫ দিন দেরি হয়েছিল। এখন বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে।

সাহাব উদ্দীন জানান, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে লবণ বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকায়। মার্চের মাঝামাঝিতে সামান্য বেড়ে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা হয়েছে। কিন্তু তার মতে, ন্যায্যমূল্য হিসেবে এটি কমপক্ষে প্রতি মণ ৪০০ টাকা হওয়া উচিত। এর ওপর নতুন আতঙ্ক হিসেবে যোগ হয়েছে লবণ আমদানির গুজব।

টেকনাফের চাষি ছলিম উল্লাহ জানান, ৭ ও ৮ এপ্রিলের পর আবার প্রবল বৃষ্টিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন পলিথিন গুছিয়ে মাঠ তৈরি করতে গেলেও যেকোনো সময় আবার বৃষ্টি নামার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকৃতির রোষের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্যের সংকট চাষিদের আরও গভীর বিপাকে ফেলেছে। মহেশখালীর চাষি খোরশেদ আলম জানান, অগ্রহায়ণ থেকে শুরু করে চৈত্র পর্যন্ত একর প্রতি সর্বোচ্চ ৪৫০ মণ লবণ উৎপাদন হয়েছে, কিন্তু সবটাই বিক্রি হয়েছে লোকসানে। দাদনের টাকাও শোধ হয়নি।

টেকনাফের গিয়াস উদ্দিন বলেন, এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ ৩০০ টাকা, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায়। চাষি আবদু জলিলের হিসাবও একই রকম- উৎপাদন খরচ ২৯০ টাকা, বিক্রিমূল্য ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা।

চাষি ছুরুত আলম বলেন, মাঠে শ্রমিকের মজুরি, ত্রিপলের খরচ, জমির ভাড়া আর ডিজেলের দাম মিলিয়ে প্রতি কেজিতে উৎপাদন খরচ ১০ টাকার বেশি। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৫ টাকারও কম দামে।

চাষি সৈয়দ আলম বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে এলে ৭ থেকে ৮ দিনের মধ্যে আবার উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। বছরের পর বছর লোকসান টানতে টানতে এখন অনেকে এই পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

টেকনাফ সাবরাং লবণ চাষি কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ আহম্মদ বলেন, সংকটের অজুহাত দেখিয়ে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে। আমদানি হলে প্রান্তিক চাষিদের দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে। লবণ উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবসায় টেকনাফে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ জড়িত।

বিসিকের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী জানান, আকস্মিক বৃষ্টিতে সাধারণত লবণ পুরোপুরি নষ্ট হয় না। তবে উৎপাদনের ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়ার সম্ভাবনা এখনো আছে বলে জানিয়েছে বিসিক।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বর্তমান বৈরী আবহাওয়া আরও ২ থেকে ৩ দিন থাকতে পারে। তবে ৫ মে থেকে বৃষ্টির সম্ভাবনা কমে যাবে। ১৪ মে থেকে তীব্র দাবদাহ শুরু হতে পারে, যা ১০ থেকে ১৫ দিন স্থায়ী হওয়ার আশা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ৬ মে থেকে চাষিরা পুরোদমে উৎপাদনে ফিরতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

গত কয়েক বছর ধরে একই চিত্র। উৎপাদন করে লোকসান, বৃষ্টিতে মাঠ ডুবে ক্ষতি, দাদনের ঋণের বোঝা- এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ দেখছেন না কক্সবাজার উপকূলের লবণচাষিরা। তাদের একটাই দাবি- ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক, লবণ আমদানি বন্ধ রাখা হোক এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক।

কুশল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]