• ঢাকা
  • ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১৭ মিনিট পূর্বে
আল আমিন
ফুলবাড়ীয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৩ মে, ২০২৬, ০৯:২৪ সকাল

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ফুলবাড়িয়ার যুবক, লাশ ফেরতের দাবি পরিবারের

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

"পড়ালেখা ছেড়ে বিদেশ গিয়েছিল, সংসারের অভাব দূর করতে। দেশে এসে বাড়ি করবে, ইট কিনে রেখেছিলাম। বিয়েও করবে বলেছিল। এখন জীবনের জন্য চিরতরে দূর হয়ে গেল। দেড় মাস আগে কথা হয়েছিল, বলেছিল ভালো আছে, কাজ করছে।

আমাদের চিন্তা করতে বারণ করেছিল। যেখানে কাজ করে, সেখানে নাকি মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা। কোনো কথা থাকলে মেসেজে বলে রাখতে বলেছিল। তারপর থেকে মোবাইল বন্ধ। এখন মোবাইলে দেখছি বন্দুকসহ আমার ছেলের ছবি। লেখা আছে যুদ্ধে মারা গেছে। ছেলে কোম্পানির চাকরিতে গিয়েছিল, যুদ্ধে গেল কিভাবে? কলিজার টুকরাকে দালালরা কোম্পানির কথা বলে যুদ্ধে দিয়েছে। আমার কলিজার টুকরা ছেলের লাশটা এনে দিন, শেষবারের মতো মুখটা দেখি।" এভাবে বিলাপ করে আহাজারি করছিলেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত যুবক আ. রহিমের মা রমিছা খাতুন।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের নামাপাড়া গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে আ. রহিম (৩০)। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে সবার বড়। জমিজমা নেই বললেই চলে। তার বাবা স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। যে টাকা বেতন পান, তা দিয়ে সংসার চালিয়ে ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারেন না। ২০১১ সালে ধামর আফাজিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল এবং ২০১৪ সালে ফুলবাড়িয়া কে আই সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন আ. রহিম। টাঙ্গাইলের সরকারি এম এম আলী কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় চরম অভাব-অনটনের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দেন। ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের অভাব দূর করতে ৬ লাখ টাকা ঋণ করে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। প্রায় ৭ বছর সিঙ্গাপুরে থাকার পর তেমন কিছু করতে পারেননি। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে দেশে চলে আসেন। এরপর অন্য দেশে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলেন। তিন লাখ টাকা ঋণ করে এক দালালের মাধ্যমে সিনোপেক কোম্পানির ভিসা নিয়ে ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর রাশিয়ায় যান। সেখানে একটি শিপে কাজ করেন। বায়ু বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে গত পাঁচ মাস আগে জমি বন্ধক দিয়ে বাড়ি থেকে আরও ৩ লাখ টাকা নিয়েছেন। নতুন ও পুরাতন কোম্পানির বেতন পেয়ে গত ১৬ এপ্রিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, আ. রহিম রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সেনা সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার বিষয়টি তারা জানতেন না।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামের মুন্সি বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। আশপাশের গ্রামের মানুষসহ প্রতিবেশীদের উপচে পড়া ভিড়। বাড়িতে ভাঙা পুরোনো টিনশেড দুটি ঘর। নতুন বাড়ি করার জন্য ইট ক্রয় করা। টিনশেড একটি ঘরে মায়ের আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে আছে। ঘরের বাইরে বৃদ্ধ বাবা অঝোরে কাঁদছেন। কেউ তাদের কান্না থামাতে পারছেন না। ছেলের শোকে কাতর বাবা-মাকে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ বোঝানোর চেষ্টা করছেন। পরিবারের একটাই দাবি, তাদের ছেলের লাশটা যাতে দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

প্রতিবেশীদের মতে, আ. রহিম শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিলেন। পরিবারের অভাবের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে ছোট দুই ভাইকে লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসার চালাতেন। এখন পরিবারের আয়-রোজগার করার মতো কেউ রইলো না।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৭ বছর সিঙ্গাপুরে থাকার পর বাড়িতে এসে এক বছর থাকেন। এক দালালের মাধ্যমে সিনোপেক কোম্পানির মাধ্যমে গত ১৮ মাস আগে রাশিয়া যান। সেখানে গিয়ে তিন থেকে চার মাস পর পর সামান্য কিছু টাকা পাঠাতেন। তা দিয়ে সংসারের পাশাপাশি ছোট দুই ভাই আ. রহমান ও আ. রাজ্জাকের লেখাপড়ার খরচ দিতেন। গত পাঁচ মাস আগে বাড়ি থেকে তিন লাখ টাকা নিয়ে নতুন করে একটি বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চাকরি নেন বলে জানতেন পরিবারের সদস্যরা। গত এক মাস আগে প্রায় দেড় লাখ টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছেন। এতে করে পরিবারের সদস্যরা মনে করেছেন, ভালো কাজ পেয়েছেন। গত ২৮ তারিখ আ. রহিম তার ছোট ভাইয়ের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে বলেছেন, সে যেখানে কাজ করে, সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা, কথা বলা যায় না। কোনো কথা থাকলে মেসেজে বলে রাখতে বলেন, সুযোগমতো উত্তর দিবেন। এরপর থেকেই মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।

আ. রহিমের সঙ্গে রাশিয়ায় একটি ক্যাম্পে রুশ সেনা সদস্য হিসেবে থাকতেন লিমন দত্ত নামের এক যুবক। সে গত রবিবার তার মেজো ভাই আ. রাজ্জাকের মোবাইল ফোনে জানায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তার একটি পা হারিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আ. রহিম ও কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার রিয়াদ নামের আরেকজন মারা গেছেন। আ. রহিমের পরিবার কিশোরগঞ্জের রিয়াদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তিনিও মারা গেছেন।

নিহতের মেজো ভাই আ. রাজ্জাক বলেছেন, "প্রথমে ওয়ার্কশপের কাজ নিয়ে রাশিয়া গিয়েছিল, এক দালাল নতুন কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় যা আমরা জানতাম না। গত ২ এপ্রিল রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় আ. রহিমের মৃত্যু হয়েছে বলে তার বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পেরেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রুশ সেনার পোশাক পরা ও বন্দুক হাতে আ. রহিমসহ পাঁচ জনের একটি ছবিও দেখতে পাই।"

নিহত আ. রহিমের পিতা আজিজুল হক বলেন, "মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা ও জমি বন্ধক দিয়ে ৬ লাখ টাকা খরচ করে পোলাডারে ওয়েল্ডিংয়ের কাজে প্রবাসে পাঠিয়েছিলাম। পরে বায়ু বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে আরও ৩ লাখ টাকা নেয়। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জানতাম না। পরে জানতে পারি, যুদ্ধে ড্রোন হামলায় মারা গেছে। ছেলের লাশ দেশে আনার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন করছি।"

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম সোহাগ জানিয়েছেন, নিহতের লাশ দেশে আনার ব্যাপারে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফরওয়ার্ডিং করে দ্রুত সময়ে লাশ আনার বিষয়ে কাজ করবো। মানবিক সহায়তা সহ প্রয়োজনীয়ভাবে নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হবে। চিহ্নিত দালালের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে সে বিষয়েও আইনগত সহায়তা দেওয়া হবে।

সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মু. কামরুল হাসান মিলন বলেন, "দালালের খপ্পরে পড়ে এই ক্ষতিগুলো হচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, লাশ আনার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া মেইনটেইন করতে হয়। নিহতের লাশ আনতে সর্বোচ্চ সহায়তা করবো। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।"

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]