আগুন শুধু দোকান পোড়ায়নি, পুড়িয়েছে শতাধিক ব্যবসায়ীর স্বপ্ন, আশা আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা সদরের প্রধান বাজারের দুটি মার্কেটে গত শুক্রবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০৫টি দোকান পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পোড়া দোকানের সামনে বসে কিছু ব্যবসায়ী কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কেউ কেউ পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আকাশপানে। চারদিকে আগুনে পোড়া কাপড়, চালের টিন, ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। কেউ কেউ পোড়া ছাইয়ের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঘুরে দাড়ানোর স্বপ্ন খুঁজছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল এই দোকান। দোকান হারানোর পাশাপাশি এখন তাদের সামনে ঋণ পরিশোধ, পরিবারের ভরণপোষণ এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারের অধিকাংশ দোকানে কাপড়, কসমেটিকস, জুতা, প্লাস্টিক সামগ্রী ও বিভিন্ন মৌসুমি পণ্য ছিল। আগুনে সেই পণ্যসহ দোকানের আসবাবপত্র ও বাকিতে বিক্রির প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও পুড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, অন্যান্য সকালের মতোই ঘুমিয়ে ছিলেন তারা। শুক্রবার ভোরে অপরিচিত নম্বর থেকে আসে কল, ঘুম ভাঙে তাদের। জানতে পারেন আগুন লেগেছে মার্কেটে। বাড়ি থেকে ভূরুঙ্গামারী বাজারে এসে দেখেন তাদের জীবনের তীলে তীলে গড়া সঞ্চয়ের দোকান গুলো জ্বলছে।
মেসার্স মামুন বস্ত্রালয়ের স্বত্তাধীকারি জাকির হোসেন জানান, আগুনে পুড়ে আমার সবকিছু শেষ শেষ হয়ে গেছে। আমার দোকানে ৫০ লাখ টাকার বেশি মালামাল ছিলো। প্রায় ১০ লাখ টাকার ডেকোরেশন ছিলো। চোখের সামনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। একটি টুকরো কাপড়ও বের করতে পারি নাই। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। এনআরবিসি ব্যাংকে ও ব্রাক এনজিও থেকে ঝণ নেওয়া আছে। কিস্তি কি ভাবে শোধ করবো ভেবে পাচ্ছি না। আমার দোকানে ৭ জন কর্মচারি কাজ করতো তাদের সংসারিই বা কেমনে চলবে। সরকার যেন আমাদের পৃর্বাসনের ব্যবস্থা করেন এবং ব্যাংক ঝণের সুদ মওকুফ করে তা পুনঃতফসীল করে দেন।
স্বপ্ন ছোঁয়া ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি আকতারুজ্জামান টুটুল জানান, আমার দোকানে প্রায় ১২ লক্ষ টাকার তৈরি পোষাকের কাপড় ছিলো। কিছুই বেড় করতে পারি নাই। আগুন আমার মতো ১০৫ জন ব্যবসায়ী আজ পথে বসিয়েছে। তিনি আরো জানান, ব্যবসা করার জন্য তারা বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন। রোজগারের একমাত্র উৎসটি চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় তারা এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন—আগুনে পুড়ে যাওয়া দোকান কি আবার গড়ে তোলা সম্ভব? ঋণের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ হবে? এখন পরিবারকে কীভাবে সামলাবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন দিন কাটছে তাদের। ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী উপজেলা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন তারা। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন তারা। এদিকে উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু তালিকা নয়, দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক( ডিসি) অন্ন পূর্ণা দেবনাথ জানালেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেছি। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর