• ঢাকা
  • ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১৮ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৬ জুন, ২০২৬, ০৩:০৯ দুপুর

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম, প্রক্সি সিন্ডিকেটের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

পরীক্ষার হলে ঢুকছেন একজন। হাতে প্রবেশপত্র, মুখে আত্মবিশ্বাসের ছায়া। কিন্তু তিনি যে পরীক্ষার্থী নন, সেটা জানেন কেবল তিনি নিজে আর যিনি তাকে পাঠিয়েছেন। আসল পরীক্ষার্থী তখন হয়তো বাড়িতে বসে অপেক্ষায়, কতটা টাকা দিলে সরকারি চাকরিটা নিশ্চিত হবে, সেই হিসাব কষতে কষতে। অথচ একই সময়ে দেশের লক্ষাধিক তরুণ বছরের পর বছর রাত জেগে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেই একটি চাকরির জন্য, যেটি আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। মেধার সঙ্গে প্রতিযোগিতা হয়নি, হয়েছে টাকার সঙ্গে। এই দুটি বাস্তবতা এখন পাশাপাশি চলছে দেশের নিয়োগব্যবস্থায়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫ ঘিরে কক্সবাজার জেলায় সংঘটিত এক নজিরবিহীন জালিয়াতির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই এক ভয়ংকর সিন্ডিকেটের তথ্য, যারা দীর্ঘদিন ধরে অর্থের বিনিময়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ব্যবসা চালিয়ে আসছে।

এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, চক্রটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্বয়ং সরকারি চাকরিজীবীরাও। অর্থাৎ যারা রাষ্ট্রের আইন, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো রক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত, তাদেরই কেউ কেউ অভিযোগ অনুযায়ী হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থা ধ্বংসের কারিগর। এ যেন সাপকে দিয়েই সাপের বিষ নামানোর ব্যবস্থা।

প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য, নথিপত্র, পরীক্ষার রেকর্ড, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আমান উল্লাহ নাহিনের (রোল: ৪৬২১০৬৫) হয়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত অংশে অংশ নেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত সিপাহী মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম।

চকরিয়া উপজেলার কোরালখালী সাহারবিল এলাকার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম কোনো সাধারণ প্রক্সি পরীক্ষার্থী নন।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি প্রক্সি সিন্ডিকেটের হয়ে বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আসছেন। অর্থের বিনিময়ে অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়া, পরীক্ষায় পাস করানো এবং চাকরি নিশ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

চক্রটির দুঃসাহসের আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যানবাহন শাখার পরিদর্শক পদে নিয়োগ পরীক্ষায়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার মতো ওই পরীক্ষাতেও অন্য এক প্রার্থীর হয়ে প্রক্সি শুটার হিসেবে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এই সিপাহী।

তথ্য বলছে, কাস্টমসের মতো স্পর্শকাতর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন ব্যক্তি কীভাবে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন? তার পেছনে কারা? কাদের ছত্রছায়ায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে?

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুরো নেটওয়ার্কটির অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) মেকানিক পদে কর্মরত। এর আগেও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগে তার নাম আলোচনায় আসে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই সিন্ডিকেট। তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে ১৬তম, ১৭তম ও ১৮তম গ্রেডের সরকারি চাকরির পদগুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ডাক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএসএইচই) এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে তাদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি।

সূত্রগুলোর দাবি, চক্রটির কার্যপদ্ধতি সুশৃঙ্খল এবং ধাপে ধাপে পরিচালিত। প্রথমে চাকরিপ্রত্যাশী সংগ্রহ করা হয়। এরপর আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে গোপনে চুক্তি সম্পাদন করা হয়। চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে প্রার্থীর কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অঙ্ক আরও বেশি হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রক্সি শুটার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই বিসিএস, ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল অর্জনকারী। তাদের মেধাকে ভাড়া করেই প্রকৃত পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে লিখিত পরীক্ষা দেওয়া হয়। শুধু লিখিত পরীক্ষাই নয়, প্রয়োজন হলে মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি, পরিচয় গোপন রাখার কৌশল এবং পরীক্ষাকেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় একটি সুসংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্কের মতো।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে কাজ করেন। কেউ পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করেন, কেউ আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন, কেউ প্রক্সি শুটার ঠিক করেন, আবার কেউ যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এই বিভাজিত কাঠামোর কারণে একজন সদস্য ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্কের তথ্য সহজে বের করা সম্ভব হয় না। কার্যত এটি একটি সেলভিত্তিক অপরাধ কাঠামো, যেখানে প্রতিটি স্তর আলাদাভাবে সক্রিয়।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে সম্পদের অস্বাভাবিক বিস্তারের তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের সঙ্গে তাদের দৃশ্যমান সম্পদ, জমি ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ, ব্যাংক লেনদেন ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয়রাও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগেও যাদের আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ মানের, তাদের অনেকেরই এখন কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা থাকলেও এতদিন তা প্রকাশ্যে আসেনি।

চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদ ইসলাম সুমন বলেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু পরীক্ষা জালিয়াতি নয়; বরং প্রতারণা, পরিচয় গোপন, জালিয়াতি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গেলে কর্ণফুলী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মেকানিক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, গুরু, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে মাফ করে দেন। এসব কাজ এখন আমি আর করি না। আপনার নিউজের কারণে মান-সম্মান যা ছিল, তা চলে গেছে। এখন বাকি জীবন আল্লাহ আল্লাহ করে কাটাতে চাই।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সিপাহী মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বলেন, আমাকে ধরে লাভ কী? আমি অল্প টাকা পাই। ছোট মানুষ। আপনি বড় ভাই আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলেন।

তবে 'রাঘববোয়ালদের ধরেন' বলে মন্তব্য করলেও সেই রাঘববোয়াল কারা, সিন্ডিকেটের পেছনে আর কারা রয়েছেন কিংবা এই নিয়োগ বাণিজ্যের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে বা কারা, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

কুশল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]