বাবা আমাকে আর ওই মাদ্রাসায় পাঠিও না’ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাবার হাত ধরে কথাগুলো বলছিল ১১ বছর বয়সি এক মাদ্রাসাছাত্রী। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পষ্ট কালশিটে দাগ, চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ।
বুধবার (১৭ জুন) সন্ধ্যার পর এ ঘটনায় শিশুটির বাবা জয়পুরহাট সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে সূত্রে জানা যায়, পড়া বলতে না পারায় জয়পুরহাট শহরের একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক তাকে বেত দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়েছেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জয়পুরহাট শহরের নতুনহাট এলাকার খাদিজাতুল কোবরা হাফেজিয়া মহিলা মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্রী। পরিবারের দাবি, গত সোমবার (১৫ জুন) সকালে ক্লাসে পড়া বলতে না পারায় মাদ্রাসার পরিচালক জালাল উদ্দিন ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও কালশিটে দাগ পড়ে। পরে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে তাকে জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার (১৭ জুন) খবর পেয়ে জয়পুরহাট সদর থানার নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কে গিয়ে দেখা যায়, শিশুটি তার বাবার সঙ্গে সেখানে অবস্থান করছে। এ সময় পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আসমা শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানের আঘাতের চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করেন। শিশুটির শরীরের হাত, পিঠ ও অন্যান্য স্থানে কালশিটে দাগ রয়েছে বলে জানায় পুলিশ ।
শিশুটির বাবা রেজুয়ান হোসেন বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে মেয়েকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলাম। সে আবাসিক থেকে লেখাপড়া করত। সোমবার সকালে ক্লাসে পড়া বলতে না পারায় তাকে বেত দিয়ে মারধর করা হয়। মারধরের পর তার জ্বর আসে এবং শরীর ফুলে যায়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ঘটনার পর মেয়েকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও দেওয়া হয়নি। সোমবার সন্ধ্যায় কোনোভাবে ফোনে কথা বলার সুযোগ পেয়ে সে কান্নাকাটি করে সব ঘটনা জানায়। পরে আমরা গিয়ে তাকে মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসি। পরদিন তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে জয়পুরহাট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করে দেই । তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষা দেওয়ার নামে কোনো শিশুর ওপর এমন নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’ অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার পরিচালক জালাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আমি মাদ্রাসার পরিচালক, নিয়মিত শিক্ষক নই। তবে মাঝে মধ্যে ক্লাস নিই। সেদিন ক্লাসে ওই ছাত্রী ছাড়া অন্য সবাই পড়া দিতে পেরেছিল। পড়া না পারায় তাকে বেত্রাঘাত করেছি। তবে এতে এমন গুরুতর আঘাত বা কালশিটে দাগ হওয়ার কথা নয়। ঘটনার পর সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে। খবর পেয়ে জয়পুরহাট শহর সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি থানায় গিয়ে শিশুটির খোঁজখবর নেন এবং তার পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেন।
জয়পুরহাট শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, আমাদের প্রতিনিধি শিশুটির সঙ্গে কথা বলেছেন। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি । বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছি।
জয়পুরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, শিক্ষার্থীর বাবা রেজুয়ান হোসেন একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি শিশু আইনের ৭০ ধারায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে । তদন্ত কাজ শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মামলার ইনভেস্টিগেশন অফিসার (আইও) এস আই আসমা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে তদন্ত করতে সরেজমিনে গিয়ে মাদ্রাসা তালা মেরে বন্ধ পাওয়া গেছে। ধারনা করা হচ্ছে ঘটনার সত্যতা থাকায় মাদ্রাসার লোকজন বন্ধ করে পালিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিশু অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার সরকারি বিধান উল্লেখ করে শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তিনি আরও জানায়, শিশু আইন, ২০১৩-এর ৭০ ধারায় শিশুর ওপর আঘাত, নির্যাতন বা এমন কোনো আচরণ, যা তার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির কারণ হয়, তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করে সব ধরনের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর