• ঢাকা
  • ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২৬, ০২:৫৯ দুপুর

দলিল নিবন্ধনে দুর্নীতির মহোৎসব, অতিষ্ঠ রামুর মানুষ

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

বিকেল সাড়ে চারটা। কক্সবাজারের রামু সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কক্ষে তখন একের পর এক ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতার ভিড়। তাদের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী ও তার ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট পুরো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসটিকে সেবাকেন্দ্রের পরিবর্তে ঘুষ বাণিজ্যের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে।

স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই ঘুষ, হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগে ভুক্তভোগীদের তোপের মুখে পড়েন সাব-রেজিস্ট্রার। কেউ অভিযোগ করেন দলিল আটকে রেখে অর্থ আদায়ের, কেউবা বলেন নামের সামান্য ভুলকে পুঁজি করে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কক্সবাজারের রামু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অভিযোগের এক ভয়ংকর চক্র। সরকারি ফির বাইরে দলিলপ্রতি নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ফাইল আটকে রেখে জিম্মি করা, নতুন নতুন শর্ত আরোপ এবং দলিল নিবন্ধন বিলম্বিত করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী ও অফিসের প্রভাবশালী মোহরার নন্দরাম দাশ বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এক শব্দের ভুল ১৫ হাজার টাকা:

রামু উপজেলার মণ্ডলপাড়া গ্রামের শিক্ষক লোকমানুল হক সম্প্রতি তার এক আত্মীয়ের জমি নিবন্ধনের সাক্ষী ছিলেন। জমিদাতার খতিয়ানে বাবার নাম ‘নাছির’-এর পরিবর্তে ‘নাদির’ লেখা থাকায় দলিল নিবন্ধন আটকে দেওয়া হয়। পরে ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার পর নিবন্ধন সম্পন্ন হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

লোকমানুল হকের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিদিনই নানা অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এ কাজে সাব-রেজিস্ট্রারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন মোহরার নন্দরাম দাশ।

দলিলপ্রতি নির্ধারিত ‘রেট’:

ভুক্তভোগী, দলিল লেখক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ফির বাইরে ‘অফিস খরচ’ নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি অলিখিত নিয়ম চালু রয়েছে।

অভিযোগ আছে, ১০ লাখ টাকার কম মূল্যের দলিলে প্রতি লাখে ১ হাজার টাকা, ১০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের দলিলে প্রতি লাখে ৭০০ টাকা, হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। শুধু তাই নয়, নামের বানানগত সামান্য অমিল, জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্যগত পার্থক্য, ‘ওরফে’ বা ‘প্রকাশ’ শব্দের ব্যবহার, এমনকি ছোটখাটো প্রশাসনিক জটিলতাকেও ঘুষ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, গত ১৭ জুন স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহে গেলে তাদের সামনেই একের পর এক অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ জুয়েল চৌধুরী বলেন, কয়েক মাস আগে তার আত্মীয়দের জমি নিবন্ধনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের সামান্য অমিল দেখিয়ে নিবন্ধন আটকে দেওয়া হয়েছিল। পরে অর্থ লেনদেনের পর দলিল নিবন্ধন করা হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর আগে তার এক চাচাতো ভাইয়ের জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও প্রায় এক লাখ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়েছিল।

স্থানীয় সাংবাদিক সোয়েব সাঈদ অভিযোগ করে বলেন, তার গ্রামের এক অসহায় নারী ছেলের নামে অল্প পরিমাণ জমি দানপত্র করতে গেলে নানা অজুহাতে নিবন্ধন করা হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেন, সেখানে ঘুষ আদায়ের সুযোগ ছিল না। তাই সেটি করেনি।

নতুন নতুন শর্ত, বাড়ছে হয়রানি:

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক জানান, বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হয়রানি ও ঘুষ আদায়ের মাত্রা বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যেসব শর্ত নেই, রামু অফিসে সেগুলো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, সেবাগ্রহীতাদের জটিলতায় ফেলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দুই বছর ধরে ভিটে শ্রেণির জমিতে স্থাপনা না থাকলেও স্থাপনা দেখিয়ে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে জমির মূল্যের পাশাপাশি ঘর বা স্থাপনার মূল্য হিসাব করেও বাড়তি অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া হেবা, দানপত্র, জীবনস্বত্ব দলিল এবং একাধিক দাগের জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দলিল লেখক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসের পরিবর্তে মাত্র তিন দিন অফিস করেন। কর্মস্থলে অবস্থানের বিধান থাকলেও তিনি চট্টগ্রাম থেকে এসে দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার যোগদানের পর থেকেই অনিয়ম, ঘুষ আদায় ও হয়রানির মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

১১ মাসে রাজস্ব ২১ কোটি টাকা:

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১১ মাসে রামু সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ৩ হাজার ৫৫৮টি দলিল নিবন্ধন হয়েছে। এসব দলিল থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা।

তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, একই সময়ে ঘুষের মাধ্যমে আদায় করা অর্থের পরিমাণ সরকারি রাজস্বের চেয়েও বেশি হতে পারে। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সরকারি সেবাকে জিম্মি করে গড়ে ওঠা এই অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে।

মোহরার নন্দরাম দাশ ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমি কোনোদিন টাকা ধরি না, কাউকে টাকার কথাও বলি না। তবে সাংবাদিকদের সামনেই এক ভুক্তভোগী ফাইল আটকে রেখে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুললে তিনি বলেন, আপনি আমাকে বলেছিলেন, তাই আমি সেবা দিয়েছি।

অন্যদিকে সাব-রেজিস্ট্রার সাহেদ হোসেন চৌধুরী বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সুনির্দিষ্ট নয় এবং সত্যও নয়। কে কাকে টাকা দিয়েছে, সেটাও আমি জানি না।

রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাস্টার মো. আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. রেজাউল করিম বকসীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি অফিসিয়াল কাজে ঢাকায় রয়েছেন বলে জানান তার কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]