জন্মের পরই সবাই বুঝতে পেরেছিল, শিশুটির দুটি হাত নেই। অনেকেই বলেছিলেন, এমন সন্তান নিয়ে বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে নিজের পায়ের আঙুল দিয়েই নতুন করে লিখেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার আয়েশা আক্তার (৩০)। দুই হাত ছাড়াই পা দিয়ে লিখে, রান্না করে, সংসারের কাজ সামলে শেষ করেছেন স্নাতকোত্তর। অথচ মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এই লড়াইয়ের পরও আজও একটি চাকরি জোটেনি তার ভাগ্যে।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার সাঘাটা ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের বাসিন্দা আয়েশা আক্তারের জন্ম ১৯৯৫ সালে। বাবা আব্দুল লতিফ ও মা সাজেদা বেগমের চার মেয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। অন্য তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেলেও বাবাকে হারানোর পর এখন মায়ের একমাত্র অবলম্বন হয়ে আছেন আয়েশা।
শৈশব থেকেই ছিল পড়াশোনার প্রবল আগ্রহ। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা তাকে সার্কাস দলে দিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে আয়েশা হার মানেননি। নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে পায়ের আঙুল দিয়েই লেখা শিখেছেন, বইয়ের পাতা উল্টেছেন, পরীক্ষা দিয়েছেন। সেই অদম্য প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেন।
সরেজমিনে আয়েশার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই হাত না থাকলেও তিনি কোনো কাজেই অন্যের ওপর নির্ভরশীল নন। পায়ের আঙুল দিয়ে খাতায় লিখছেন, কুলায় চাল ঝাড়ছেন, বটিতে তরকারি কাটছেন, এমনকি সংসারের নিত্যদিনের কাজও দক্ষতার সঙ্গে করে চলেছেন। যেন পা-ই তার হাত, পা-ই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রতিবেশী বিলা বেগম বলেন, "অনেক মানুষ আসে, ভিডিও করে, ছবি তুলে চলে যায়। কিন্তু মেয়েটার জন্য বাস্তবে কেউ কিছু করে না। অথচ দুই হাত ছাড়াই পা দিয়ে সংসারের সব কাজ করে। কেউ যদি একটা চাকরি দিত, তাহলে ওর জীবনটা বদলে যেত।"
চাচা জহুরুল ইসলাম বলেন, "আয়েশা জন্মগত প্রতিবন্ধী হলেও কখনো নিজের দুর্বলতাকে দুর্বলতা মনে করেনি। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। এখন শুধু একটা চাকরি পেলেই সে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান তার পাশে দাঁড়ালে মেয়েটার জীবন বদলে যাবে।"
কথা বলতে গিয়ে বারবার চোখ ভিজে ওঠে মা সাজেদা বেগমের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, "জন্মের পর কত মানুষ কত কথা বলেছে। কেউ বলেছে, এই মেয়েকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। কিন্তু আমি কখনো মেয়েকে বোঝা ভাবিনি। আজ সে পা দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর করেছে। একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় গর্ব আর কী হতে পারে? শুধু একটা চাকরি হলে মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত। তখন আমি চোখ বন্ধ করেও শান্তি পেতাম।"
আয়েশার কণ্ঠেও ফুটে ওঠে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। তিনি বলেন, "আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। পা দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর শেষ করেছি। আমি কারও দয়া চাই না, ভিক্ষাও চাই না। আমি শুধু আমার যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি চাকরি চাই। আমি চাই নিজের উপার্জনে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে।"
তিনি আরও বলেন, "মানুষ অনেক সময় টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেন। কিন্তু আমার জন্য সবচেয়ে বড় সহায়তা হবে একটি কর্মসংস্থান। আমি সুযোগ পেলে নিজের যোগ্যতা দিয়েই প্রমাণ করতে চাই, প্রতিবন্ধকতা কখনো স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না।"
সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট বলেন, "আয়েশা আমাদের এলাকার গর্ব। তার মতো সংগ্রামী ও মেধাবী একজন মেয়ের পাশে সমাজের সবাইকে দাঁড়ানো উচিত। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করব।"
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর বলেন, "আয়েশা আক্তারের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ঈদের সময় আমরা তার সঙ্গে দেখা করেছি এবং সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তার মতো মেধাবী একজন শিক্ষিত প্রতিবন্ধী নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি তাকে আরও সরকারি সহায়তার আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।"
জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা আয়েশার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। নিজের পায়ের আঙুলকে হাত বানিয়ে তিনি জয় করেছেন শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় ধাপ। এখন তার একটাই প্রত্যাশা—সমাজের করুণা নয়, যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে একটি চাকরি। কারণ, সেই একটি সুযোগই বদলে দিতে পারে সংগ্রামে লেখা তার পুরো জীবনের গল্প।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর