ভারতীয় ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)। এমনকি সেখানে সামরিক ঘাঁটি তৈরির পাশাপাশি চারণভূমি ও কৃষিজমিসহ বিস্তৃত এলাকা দখলে নিয়েছে তারা। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের একটি আদিবাসী সংগঠন এমনটাই অভিযোগ করেছে। তবে আদিবাসী সংগঠনের এই দাবি অস্বীকার করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। কলকাতাভিত্তিক এই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) পাকাপোক্ত ঘাঁটি গড়ে ফেলেছে বলে দাবি করেছে অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আদিবাসীদের একটি সংগঠন। তাদের অভিযোগ, চীনা সেনাবাহিনীর দখলদারির ফলে গত ছয়বছর ধরে ওই এলাকায় স্থানীয়দের চাষের কাজ এবং পশুচারণ বন্ধ হয়ে গেছে।
যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই অভিযোগ খারিজ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অরুণাচল প্রদেশে চীনের সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ এবং সেখানে ঘাঁটি স্থাপনের অভিযোগ করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যে সব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা ভুল এবং ভিত্তিহীন।’
মূলত অরুণাচল প্রদেশের উত্তর অংশে চীনের তিব্বত ভূখণ্ডের পাশেই অবস্থিত ওই অঞ্চলে ‘নাহ’ আদিবাসীর লোকেরা বাস করেন। তাদের সংগঠন ‘নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’-র সভাপতি কেরু চাদের টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদককে বলেন, ‘ওই জমি আমাদের পূর্বপুরুষদের। সেখানে বহু যুগ ধরে তারা শিকার, পশুচারণ এবং চাষাবাদ করেছেন।’
কিন্তু সীমান্তের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) লাগোয়া আপার সুবনসিরি জেলার অন্তত পাঁচটি এলাকায় ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে চীনা সামরিক বাহিনী স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণ করেছে এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের সেখানে যেতে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কেরু চাদের।
এমনকি গত ১২ বছর আগে মাঝে মধ্যে ওই এলাকাগুলোতে চীনের সেনাবাহিনী ঢুবে পড়তো বলে জানিয়েছেন কেরু। কিন্তু ২০২০ সালে তারা পাকাপাকি ভাবে ওই ভূখণ্ডগুলো দখল নেয়। তিনি বলেন, ‘‘কার্যত ওই সময় থেকেই আমাদের সেখানে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে’।
আসাফিলা এলাকায় ওয়িং এবং পানিয়ার (চুজার্তা এলাকা), মারপান (মারনাফে), পোত্রাং (হ্রদ) ও টিনডিংতাং (টিজি)-তে চীনের এমন দখলদারির ঘটনা ঘটেছে বলে জানান কেরু চাদের। এসব স্থান তাকসিং সদর দপ্তরের কাছাকাছি এবং কয়েকটি এলাকাকে স্থানীয়রা তীর্থস্থান হিসেবেও বিবেচনা করেন।
প্রসঙ্গত, বছর কয়েক আগে লাদাখেও একই ভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে স্থানীয় পশুপালকদের বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল চীনের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। কিন্তু সে সময় কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছিল, লাদাখে ভারতের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও চীন দখল করেনি।
টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, সম্প্রতি আপার সুবানসিরি জেলার ডেপুটি কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির (এনডব্লিউএস) সভাপতি কেরু চাদের। সেখানে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও যেসব পূর্বপুরুষের জমিতে আমরা অবাধে শিকার করতাম, বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতাম এবং গবাদিপশু চরাতাম, সেগুলো এখন চীনা সামরিক বাহিনীর দখলে।’
এনডব্লিউএসের অভিযোগ, আপার সুবানসিরির তাকসিং রাজস্ব সার্কেলের আওতাধীন পাঁচটি এলাকায় চীন ধীরে ধীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করছে। সংগঠনটির দাবি, আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো কৌশলগতভাবে দখল করে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে চীনা সরকার।
এ বিষয়ে নাচো এলাকার বিধায়ক নাকাপ নালো বলেন, বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই অভিযোগগুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এটি জাতীয় ইস্যু হওয়ায় অভিযোগগুলো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ রয়েছে।’
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে তাকসিং সীমান্ত এলাকায় চীনের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংগঠনটির দাবি, যত বেশি সম্ভব এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়াই চীনের সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য।
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ভারতের ভূখণ্ডের ভেতরে চীনা সেনাবাহিনী সামরিক ক্যাম্প ও সড়ক নির্মাণ করেছে।
কেরু চাদের বলেন, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তারা বহু বছর ধরে আমাদের সীমান্ত রক্ষা করছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু তাদের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। তাকসিং এলাকায় চীনা সামরিক বাহিনীর তৎপরতার গতি ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে আমাদের ভূমি হারাচ্ছি।’
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসন বা অরুণাচল প্রদেশ সরকার কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এমনকি জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর