প্রবাসে ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্য ও বর্ণবাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেছিলেন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনপ্রবাসী ভারতীয় লেখক নিবেদিতা শুক্লা। তবে পোস্টের শেষাংশে এক পাকিস্তানি নাগরিকের প্রতি নিজের আচরণের বর্ণনা দেওয়ার পরই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
দ্য মোমেন্টোস অব রুনঝ–এর এই লেখিকা জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে ১০ ঘণ্টার ট্রানজিটের অভিজ্ঞতা নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন।
পোস্টে নিবেদিতা লেখেন, বিমানবন্দরে তিনি এমন একজন ব্যক্তিকে দেখেন, যাকে তাঁর আর্থিকভাবে অসচ্ছল মনে হয়েছিল। সহানুভূতির বশে তিনি নিজের সঙ্গে থাকা খাবার নিয়ে ওই ব্যক্তির কাছে যান।
তিনি জানান, কথোপকথনের শুরুতে হিন্দিতে ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ডাবলিন থেকে এসেছেন কি না। ইতিবাচক উত্তর পাওয়ার পর গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি পাকিস্তানের করাচিতে যাচ্ছেন।
নিবেদিতার দাবি অনুযায়ী, এ কথা শোনার পর তিনি খাবারটি না দিয়েই ফিরে আসেন। পোস্টের শেষেও তিনি একটি অবমাননাকর হিন্দি বাক্যাংশ ব্যবহার করেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও বিতর্কের জন্ম দেয়।
প্রবাসে নিজের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে পোস্ট শুরু করলেও, একজন পাকিস্তানি নাগরিকের প্রতি তাঁর আচরণকে অনেকেই ভণ্ডামি ও বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দেন। সমালোচনায় অংশ নেন ভারতীয় ও পাকিস্তানি—উভয় দেশের ব্যবহারকারীরা।
এক ভারতীয় ব্যবহারকারী লেখেন, “আপনি কয়েকটি অনুচ্ছেদ ধরে অভিযোগ করলেন যে মানুষ আপনার পাসপোর্ট দেখে আপনাকে বিচার করে। অথচ পরের মুহূর্তেই আপনি একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে তাঁর জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করলেন। এই ঘটনায় আপনি বৈষম্যের শিকার নন, বরং বৈষম্যের উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।”
আরেকজন মন্তব্য করেন, “এই ধরনের মানসিকতার কারণেই আজ বিশ্বজুড়ে ভারতীয়দের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ঘৃণার রাজনীতি বহু মানুষের চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।”
আরেক ব্যবহারকারীর ভাষ্য, “আপনার টুইটে যে মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে, সেটিই হয়তো অন্য কোথাও আপনার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
কেউ কেউ বিষয়টিকে মনস্তাত্ত্বিক ‘প্রজেকশন’ উল্লেখ করে মন্তব্য করেন, “আপনার অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত আপনার নিজের মানসিকতারই প্রতিফলন।”
ঘটনাটি নিয়ে পাকিস্তানি ব্যবহারকারীরাও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একজন লেখেন, “আমি কখনো কোনো পাকিস্তানিকে একজন ভারতীয়র সঙ্গে এমন আচরণ করতে দেখিনি বা শুনিনি। আপনার মনে এত ঘৃণা কেন?” আরেকজনের দাবি, “পাকিস্তানে আসা ভারতীয়দের সঙ্গে সাধারণত এমন আচরণ করা হয় না।”
প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আরেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “বিদেশে গেলে জাতীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতা পেছনে ফেলে আসা উচিত। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমরা সবাই সমান যাত্রী। আমি যেমন কিছু ভারতীয়র কাছ থেকে খারাপ অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তেমনি অনেক পাকিস্তানির কাছ থেকেও আন্তরিক সহায়তা পেয়েছি।”
নিজের দেশের মানুষই এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে এক নেটিজেন লেখেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আপনার নিজের দেশের এবং ধর্মের মানুষই আপনার এই বর্ণবাদী ও ঘৃণ্য কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।’
তীব্র সমালোচনার মুখে পড়া এই পোস্টটি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্য, মানবিকতা ও জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতার এক বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর