সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নতুন অর্থবছর থেকে বাড়বে বলে বাজেট বক্তব্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় পুরো বিষয়টি অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
গেজেট না হওয়ায় গ্রেডভিত্তিকভাবে কার বেতন কত বাড়বে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে কি না, নাকি সরকার নতুন কোনো কাঠামো আনবে—তাও স্পষ্ট নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে এবং সেটি এখন চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। সেখানে বেতন বৃদ্ধির হার, ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন এবং মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন অর্থবছর থেকেই বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা থাকলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে আরও সময় লাগতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে নতুন কাঠামো কার্যকর হলে তা বকেয়াসহ পরিশোধের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, বিষয়টি “যথাসময়ে” বাস্তবায়ন করা হবে।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বেতন কাঠামো পরিবর্তন এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট সক্ষমতা বিবেচনায় রাখা দরকার।
নতুন কাঠামোয় বেতন কবে থেকে?
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর মূল বেতনের ওপর নির্ধারিত ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি দেওয়া হলেও নতুন কোনো পে স্কেল আর আসেনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় আছেন সরকারি কর্মচারীরা।
২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫’ গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশন ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে।
সুপারিশে বর্তমান সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতার সংস্কারের কথাও বলা হয়।
কমিশনের মতে, গত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক সূচক ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই এ সুপারিশ করা হয়েছে। পুরো প্রস্তাব বাস্তবায়ন করলে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হয়, যা জাতীয় বাজেটে বড় চাপ তৈরি করবে।
পরবর্তীতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে, যা নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া তৈরি করেছে। বর্তমানে সেই খসড়ার ভিত্তিতে গেজেট প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় রেখেই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, ইশতাহারে যথাসময়ে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী পর্যালোচনা চলছে। তবে গেজেট কবে হবে—এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সময় জানাননি, শুধু বলেছেন এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে। তবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
পে স্কেল পর্যালোচনা কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ হারে বাড়ানো এবং পরবর্তী পর্যায়ে ভাতা কার্যকরের পরিকল্পনার কথাও ছিল। নতুন কাঠামোতেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে ধারণা দেওয়া হচ্ছে, চলতি মাসের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
এছাড়া বাজেটের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত বরাদ্দের মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা রয়েছে, তবে বাজার পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাঁর মতে, শুধু আগের কমিশনের সুপারিশ নয়, বর্তমান অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কারণ মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবার ওপরই সমানভাবে পড়ে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর বেতন কাঠামো হালনাগাদ করা ইতিবাচক হলেও এর পরিমাণ সার্বিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় এখনো কম। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এই ব্যয়কে শুধু খরচ হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা ও শিক্ষা ভাতার মতো অন্যান্য সুবিধাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে, যা সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বেতন বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদও বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন জনগণের টাকায় দেওয়া হয়, তাই সেবা প্রদানের মান নিশ্চিত না করে শুধু বেতন বাড়ালে তা কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও আনতে পারে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন একটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হলেও তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি ও সেবার মান বিবেচনায় রেখেই নিতে হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর