সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে টিকে থাকা মানুষের লড়াইয়ে এবার যুক্ত হলো মেগা প্রকল্পের টেকসই বাঁধ। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের অবৈধভাবে লবণ পানি ঢোকানোর জন্য বাঁধ কেটে 'নাইটি পাইপ' স্থাপনের ঘটনা এখানকার মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছিল। একাধিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিতে পারছিল না।
গত ২ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে গাবুরায় আসেন প্রথম সারির সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিম। সুন্দরবনের বনজীবীদের খবর সংগ্রহ ও মেগা প্রকল্পের বাঁধ পরিদর্শনের সময় তিনি বাঁধ কাটার ভিডিও ধারণ করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে বাঁধ কাটা ও পাইপ স্থাপনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সুশীল সমাজ সকলেই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। গাবুরার সর্বস্তরের মানুষ মানববন্ধন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে।
জনরোষ ও গণমাধ্যমের চাপের মুখে অবশেষে নড়েচড়ে বসে উপজেলা প্রশাসন। ৭ জুলাই মঙ্গলবার সকাল থেকে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনকের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে অংশ নেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাশেদ হোসাইন, শ্যামনগর থানার ওসি মো. শফিউল পাটোয়ারী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. ইমরান হোসেন, গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ। গাবুরা ইউনিয়নের উপকূলজুড়ে অবৈধ নাইটি পাইপ উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি পাইপও অবশিষ্ট থাকতে অভিযান বন্ধ হবে না।
গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম বলেন, উপকূল রক্ষায় মেগা প্রকল্পের বিকল্প নেই। কেউ যদি ব্যক্তি স্বার্থে তা নষ্ট করে, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক বলেন, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্টের অপরাধ। এই অপরাধ নির্মূলে আমরা অভিযান শুরু করেছি এবং এটি চলমান থাকবে। পুনরায় যদি কেউ এ ধরনের অপরাধের সাথে যুক্ত হয় তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শ্যামনগর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ফরিদুল ইসলাম জানান, গাবুরাতে অবৈধ নাইটি উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে এবং এটি চলমান থাকবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুন বলেন, গাবুরার মতো দ্বীপ ইউনিয়নে একটি ছিদ্রই পুরো বাঁধকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এটি শুধু অপরাধ নয়, এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নাশকতা। সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিম বলেন, মানুষের অধিকারের জন্য কলম ধরেছি, সেটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চলবে। গাবুরাবাসী চায় সর্বশেষ পাইপটি উচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে অভিযান শেষ হোক। সংশ্লিষ্ট ও প্রশাসনের কাছে আমিও এটাই প্রত্যাশা করি।
এতো এতো প্রতিশ্রুতি, সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিমের সাহসী প্রতিবেদন আর প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে গাবুরার মানুষ। তাদের একটাই দাবি উপকূল রক্ষার এই লড়াই যেন থেমে না যায়। আবার যেন নাইটি নামক অভিশাপ আর লোনাপানির ওঠানামার খেলায় ধ্বংস না হয় উপকূলীয় জনপদ।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর