পঙ্গু ও অসহায় বাবাকে জীবন্ত মাটি চাপা দিতে ছেলের বিরুদ্ধে গোপনে ঘরের ভিতর কবর খোঁড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ছেলেকে হাতেনাতে আটক করেছে গ্রামবাসি। বাবার অভিযোগ তাকে মাটিচাপা দিয়ে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই ছেলে এমন কাজ করেছে।
খবর পেয়ে তার মা ও বড় বোন মাদকাসক্ত দাবি করে থানায় অভিযোগ করার কথা বলে, গ্রামবাসির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গ্রাম ছেড়েছে। বুধবার জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বানিয়াচাপড় গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে থানায় কোন অভিযোগ করা হয়নি। ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, ক্ষেতলালের বানিয়াচাপড় গ্রামের আব্দুস সালাম (৪৮) পেশায় ছিলেন কৃষক। জমি-জমা খুব বেশি না থাকলেও ছিলেন স্বচ্ছল। স্ত্রী এবং দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার বেশ ভালই চলছিল। কিন্তু পাঁচ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায়। সেই থেকে কোমড় থেকে দুই পা পর্যন্ত অবস হয়ে যায়। নানা চিকিৎসার পরও সুস্থ্য না হওয়ায় সেই থেকেই বিছানায় শুয়ে দিন কাটে তার। বড় মেয়ে সুরাইয়া আক্তার এম.এ পাশ করার মা ও অন্য ভাই বোনদের নিয়ে জীবিকার তাগিদে পাশবর্তী বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলা শহরে ফুচকা বিক্রি করে কোন রকমে সংসার নির্বাহ করেন।
আর সালাম নিজের টিন সেডের বিশাল মাটির বাড়ির খোলা বারান্দায় বড় ছেলে মোস্তাকিমের তত্বাবধানে মেঝেতে থাকেন। খাওয়া দাওয়া সবকিছুই চলে তার বিছানায়। প্রথম প্রথম ছেলে মোস্তাকিম ভালো আচরণ করলেও হঠাৎ করেই বদলে যায়। নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে বাবার সাথে খারাপ আচরণ শুরু করে। হত্যার হুমকি সহ মারধর সহ প্রায়ই গালাগাল দিতেন। নেশার জন্য পঙ্গু বাবার কাছে টাকা দাবি করতেন। দিতে না পারলে হাতে যা পেত তাই নিয়ে মারার জন্য তেড়ে ওঠতেন। তাকে নিয়ে বাবা সালাম খুব ভয়ে থাকতেন।
গত কয়েকদিন থেকে মোস্তাকিমের আচরণে সন্দেহ হয় সালামের। মোস্তাকিম একা একা ঘরের মধ্যে কি যেন করে। বালতি বালতি নিয়ে যায়। পরিশ্রান্ত হয়ে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এসব দেখে সালাম ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বুধবার দুপুরের দিকে সালাম তার চাচাতো ভাই রাজুকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে ডেকে তার ঘর খুলে দেখার জন্য অনুরোধ করেন। রাজু তার কথামত ঘর খুলে এক কোণে প্রায় পাঁচ ফুট প্রস্থ ও সাত ফুট গভীর এক বিশাল গর্ত এবং গোটা ঘর জুরে বেশ কয়েকটি মাটির বস্তার পাশাপাশি অন্য ঘরের মেঝেতে কাদা-মাটির স্তুপ দেখতে পান। এতে তাদের সন্দেহ হয় পঙ্গু বাবাকে গোপনে মাটিচাপা দেওয়ার জন্যই ঘরের মেঝে খুঁড়ে রাখে মোস্তাকিম। বাবা সালামও দাবি করেন, তাকে গর্তে ফেলে মাটিচাপা দেওয়ার জন্যই ঘরের মেঝে খোঁড়া হয়েছে। ঘটনাটি জানাজানির পর গ্রামবাসি মোস্তাকিমকে আটক করে বেঁধে রাখলেও নেশাগ্রস্থ দাবি করে বিষয়টি থানায় অভিযোগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার মা ও বড়বোন মোস্তাকিমকে ছাড়িয়ে নেয়। ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
বানিয়াচাপর গ্রামের রাজু আহমেদ বলেন, মোস্তাকিম এর বাবার অনুরোধে তাদের ঘর খুলে গর্ত খোঁড়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। ঘরের মধ্যে কাদামাটি ছাড়াও বেশ কয়েক বস্তা শুকনো মাটিও রাখা আছে। যা সন্দেহজনক। প্রশাসন চেষ্টা করলেই এ রহস্য উন্মোচিত হবে। তার বড় বোন সুরাইয়া বেগমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ভাই নেশায় আসক্ত। ঘরের কোণায় গর্ত খোঁড়ার বিষয়টি যে বাবাকে হত্যার জন্য তা সঠিক নয়। অন্য কারণও থাকতে পারে। আমরা এ ব্যাপারে থানায় লিখিত অভিযোগ করবো। প্রশাসন তদন্ত করলেই গর্ত খোঁড়ার সঠিক কারণ জানা যাবে।
তবে আব্দুস সালামের দাবি, মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করার জন্যই তার ছেলে গোপনে ঘরের ভিতর গর্ত খুঁড়েছে। তার কাছে প্রতিদিন বাহির থেকে লোকজন আসতো। নুন থেকে পান খসলেই গালাগালি করতো। হাতে যা থাকতো তাই নিয়ে মারমুখি হতো। মাঝে মধ্যেই হত্যা করার হুমকি দিত। বিষয়টি জানাজানি না হলে হয়তো আমার কেউ খোঁজই পেত না। আমি ছেলের জন্য ভয় পাই। আল্লাহর কাছে মৃত্যুর জন্য কান্নাকাটি করি, কিন্তু মৃত্যু তো হয় না। আমি আর বাঁচতে চাই না। জীবনে অনেক কষ্ট করে চার সন্তানকে মানুষ করেছি। সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা পর্যন্ত করিনি। আমার স্ত্রীও খারাপ ব্যবহার করে। পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। বেঁচে থাকা পর্যন্ত তিনি নিজের নিরাপত্তা দাবি করেন।
ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আব্দুল করিম বলেন, বিষয়টি শুনেছি তবে এ নিয়ে কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর