সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় থেকে নেমে আসে অস্ত্রধারীরা। সামনে যাকে পায়, তাকেই তুলে নিয়ে যায়। পরে ফোন আসে পরিবারের কাছে, দাবি করা হয় লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। কাউকে না পেলে চলে লুটপাট, ভাঙচুর, গুলিবর্ষণ। এমন আতঙ্কে এখন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের জুম্মাপাড়া এলাকার মানুষ।
গত তিন সপ্তাহে দুটি অপহরণের ঘটনার পর অন্তত ২০০ পরিবারের সদস্য নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে চলে গেছেন। অনেক বাড়িতে ঝুলছে তালা। পুরো এলাকা এখন জনশূন্য বাড়ি আর সুনসান নীরবতার এক অচেনা দৃশ্য। দিনের বেলাতেও পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় যেতে ভয় পাচ্ছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টেকনাফের বাহারছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৯৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরও ইতোমধ্যে ঘটেছে অন্তত ২০টি অপহরণের ঘটনা।
এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজার জেলার আইন-শৃঙ্খলা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং টেকনাফের জননিরাপত্তা নিয়ে গত সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় অপহরণপ্রবণ এলাকায় যৌথ অভিযান ও টহল জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এমন দেখিনি’:
১৮ জুলাই, সকাল ১১টা। জুম্মাপাড়ার একটি চায়ের দোকানে বসে দুই মধ্যবয়সী বাসিন্দা কথা বলছিলেন নিজেদের মধ্যে। তাদের একজনের কণ্ঠে ৫৫ বছরের জীবনের গভীর হতাশা- মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এলাকা ছেড়ে পালাতে হয়নি কাউকে, অথচ এখন ঘর থেকে বের হওয়াই মানে অপহরণের ঝুঁকি নেওয়া।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু তৈয়বের ভাষ্য, এলাকার ভূগোলই এখন এর সবচেয়ে বড় শত্রু। পাহাড়ঘেরা এই জনপদের পাদদেশে পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস, আর পাহাড়ের চূড়ায় ঘাঁটি গেড়েছে অস্ত্রধারীরা। রাত নামলেই তারা নেমে আসে নিচে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, পাহাড়সংলগ্ন এলাকার দিকে এগোতে চাইলে স্থানীয় এক বাসিন্দা রীতিমতো সতর্ক করে দেন- ওদিকে গেলে অপহরণের শিকার হতে পারেন যে কেউ। স্থানীয় দুই যুবককে সঙ্গী করে সামনে এগিয়ে দেখা মেলে পাহাড়ের পাদদেশের একের পর এক জনশূন্য বাড়ি।
ফেরার পথে দেখা মেলে রুবী আক্তার নামের এক নারীর, যিনি সাময়িক প্রয়োজনে নিজের বাড়িতে ফিরেছিলেন কিছু মালপত্র আনতে। তিন সপ্তাহ ধরে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া রুবী জানান, প্রায় প্রতি রাতেই সশস্ত্র লোকজন এসে গুলি চালায়, দরজা ভাঙচুর করে, লুটপাট চালিয়ে চলে যায়— এই আতঙ্কেই তিনি ঘরছাড়া।
১৬ জুলাই রাতের ঘটনা আরও ভয়াবহ। এশার নামাজের আগে অজু করতে বের হয়েছিলেন নাজমা আক্তার। স্বামী প্রবাসে, দুই সন্তান নিয়ে একা থাকেন তিনি। হঠাৎ বাড়ির উঠানের কাছে শুরু হয় গোলাগুলি। প্রায় দশ মিনিট ধরে চলা সেই গুলিবর্ষণ ছিল আসলে পরীক্ষা। ঘর থেকে কেউ বের হয় কি না, তা দেখারই কৌশল।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শুধু জুম্মাপাড়া নয়, বাহারছড়া ইউনিয়নের অন্তত ২০০ পরিবারের সদস্য প্রাণভয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। মোহাম্মদ হোসেন, জাহেদ হোসেন, মোহাম্মদ রফিক, মুজিব উল্লাহ, নব্বী হোসেন, লিয়াকত আলী, ফেরদৌস, মোহাম্মদ শফিক, ছৈয়দ আলম, মোহাম্মদ আয়ুব, খালেদা বেগম, মাহফুজ আক্তার, আবুল হাশিম, মুজিবুল্লাহসহ অনেকেই এখনো সাহস করে ফিরতে পারেননি ঘরে।
২৮ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মুখে অপহৃত হন পল্লি চিকিৎসক কামাল উদ্দিন (স্থানীয়ভাবে পরিচিত কামাল মাস্টার নামে)। আট দিন আটকে রাখার পর দুই লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে ৬ জুলাই রাতে তাঁকে মৌচনী এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, অপহরণকালে নির্যাতনের ধকল এখনো কাটেনি তার।
১৭ জুলাই বিকেলে ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। বাহারছড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর নয়াপাড়ায় মহিষ আনতে যাওয়া ১২ বছরের শিশু আরাফাতকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা, দাবি করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ। পরিবার শেষ পর্যন্ত চার লাখ টাকা দিয়ে সোমবার শিশুটিকে উদ্ধার করে আনে। নোয়াখালী কচ্ছপিয়া পাহাড় থেকে ১০০ মিটার দূরে বাড়ি মো. ইমরানের। গত মে মাসে অপহৃত হওয়ার পর দুই লাখ টাকা মুক্তিপণে মুক্তি মেলে তার।
ইমরানের ভাষ্য, উদ্ধার-অভিযান শুরু হলেই অপহরণকারীরা জিম্মিদের হাত-পা-চোখ বেঁধে নির্যাতন করে। পুলিশকে খবর দেওয়ার মূল্য চোকাতে হয় শরীরে।
তিন সশস্ত্র গ্রুপ, দুর্গম পাহাড়ি আস্তানা:
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে, রোহিঙ্গা ও বাঙালি সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা অন্তত তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ- রেদওয়ান গ্রুপ, বুলেট গ্রুপ ও আবুল গ্রুপ। এই অপহরণকাণ্ডে সক্রিয়। জিম্মিদের প্রথমে নেওয়া হয় জুম্মাপাড়া পাহাড়ে, পরে স্থানান্তর করা হয় হ্নীলা ইউনিয়নের জুম পাহাড়ে। সেখানেই বসে ঠিক হয় মুক্তিপণের অঙ্ক আর ‘না দিলে কী হবে’র সিদ্ধান্ত। কচ্ছপিয়া, জুম্মাপাড়া পাহাড়, উনচিপ্রাংয়ের জুম পাহাড়, মিজ্জির পাহাড়- এই দুর্গম এলাকাগুলোই তাদের অভয়ারণ্য, আর কাজে ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ও ভারী অস্ত্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রের রয়েছে সংগঠিত তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক। কার আর্থিক অবস্থা ভালো, কার স্বজন প্রবাসে, কাকে অপহরণ করলে দ্রুত মুক্তিপণ মিলবে, এসব আগেভাগেই জেনে পরিকল্পিত টার্গেট বাছাই করে তারা। ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে প্রবাসী পরিবারগুলো। আগে মানবপাচারে জড়িত থাকা কিছু চক্র এখন অপহরণ-বাণিজ্যে নাম লিখিয়েছে বলেও জানা গেছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫- এই তিন বছরে টেকনাফের বাহারছড়াসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত ২৯৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরেই ঘটেছে আরও অন্তত ২০টি ঘটনা। একই সময়ে বেড়েছে হত্যা ও সশস্ত্র সহিংসতাও। ৩ মে নোয়াখালীপাড়া ব্রিজ এলাকায় অপহরণচেষ্টার সময় গুলিবিদ্ধ হন ১৯ বছরের তরুণ শহিদ উল্লাহ। এপ্রিলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান তরুণী সুমাইয়া। একই মাসে পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার হয় বস্তাবন্দি এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির খণ্ডিত মরদেহ, সঙ্গে আরও তিনজনের রক্তাক্ত লাশ।
টেকনাফ উপজেলা সদর থেকে জুম্মাপাড়ার দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার, বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার। অপহরণ বা হামলার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছাতে সময় লাগে অন্তত আধাঘণ্টা- এই ফাঁকেই কাজ সেরে নিরাপদে সটকে পড়ে সন্ত্রাসীরা। এই ভৌগোলিক বাস্তবতাই যেন সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম পল্লি চিকিৎসক অপহরণের ঘটনায় মুক্তিপণ আদায়ের তথ্য পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে জড়িতদের গ্রেপ্তারে যৌথ অভিযানের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বেশির ভাগ ঘটনায় জড়িতদের এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা অন্যরকম:
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে বসে জরুরি সভা। উপস্থিত ছিলেন উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামিম আরা স্বপ্না, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানান, সভায় মাদক ও অপহরণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীও দ্রুত সমন্বিত অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কিন্তু জুম্মাপাড়ার বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রশাসনের সভাকক্ষের আশ্বাস আর পাহাড়ের পাদদেশের জনশূন্য বাড়িগুলোর মধ্যে দূরত্ব এখনো ২০ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি। যতক্ষণ না পাহাড়চূড়ার আস্তানাগুলো ভাঙা যাচ্ছে, ততক্ষণ রুবী আক্তার কিংবা নাজমা আক্তারদের কাছে নিরাপত্তা থেকে যাবে কেবল একটি প্রতিশ্রুতি- যা রাত নামলেই ফিকে হয়ে যায় গুলির শব্দে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর