ঠাকুরগাঁও জেলা এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং প্রকল্পের ফাইল স্বাক্ষরের জন্য ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও, জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মামুন বিশ্বাস দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তিনি সরকারি প্রোটোকল ভেঙে সপ্তাহে দুদিন ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। এতে সপ্তাহে প্রায় ৭ হাজার ২০০ টাকা, মাসে ২৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং বছরে ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা তেল খরচ হয়। পরিবার ঢাকায় থাকায় তিনি প্রতি সপ্তাহে বিমানযোগে যাতায়াত করেন এবং এ যাতায়াতে তিনি নিজ দপ্তরের গাড়ির পাশাপাশি অন্য দপ্তরের (বিএডিসি’র) গাড়িও ব্যবহার করেন। তাঁর এসব কাজের অন্যতম সহযোগী ছিলেন এলজিইডি’র সাবেক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিউল আলম (বর্তমানে পঞ্চগড় এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী)। বিমানের টিকিটে তাঁর সপ্তাহে প্রায় ১২ হাজার টাকা, মাসে ৬০ হাজার টাকা এবং বছরে ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। সরকারি চাকরির পঞ্চম গ্রেডে এই কর্মকর্তার বাড়ি ভাড়া ১৭ হাজার টাকা বাদ দিয়ে মাসিক বেতন পান ৫৫ হাজার টাকা। প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর আয়ের থেকে এই অতিরিক্ত অর্থের উৎস কী? শুধু তাই নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে তিনি প্রতিদিন নিজের খেয়ালখুশি মতো অফিসে আসেন। এর সুযোগ নেন অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি একসময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি ভোল পাল্টে নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরেছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব) এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
একই অভিযোগ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা জানান, পূর্বে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তিনি খোলস পাল্টে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ একজন হয়ে উঠেছেন এবং ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতাদের সাথেও তাঁর সখ্যতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ফাইল স্বাক্ষরের জন্য জমা দিতে গেলে হাজার থেকে লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। টাকা না দিলে ফাইল টেবিলেই পড়ে থাকে। ঠিকাদারদের জিম্মি করে ও কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নেন। তাঁর স্ত্রী ও স্বজনদের নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড় রয়েছে। তাই দ্রুত এই অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত প্রয়োজন।
ঠিকাদার সহ কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাঁর ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ। তাঁর অফিসের গাড়ি চালক সহ বেশ কয়েকজন কর্মচারী জানান, মামুন বিশ্বাসের খুঁটির জোর অনেক, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা ও হেড অফিসেও তাঁর সখ্যতা আছে। তাই তিনি অনেক ক্ষমতা নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেন, কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। ঠাকুরগাঁও এলজিইডি’র সাবেক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিউল আলম (বর্তমানে পঞ্চগড় এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী) জানান, "স্যার (মামুন বিশ্বাস) হয়তো ভুল করে ফেলেছেন, বিষয়টি এবারের মতো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে ভালো হতো।" অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করায় প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাস কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। বিভিন্ন অজুহাতে নিজের করা অনিয়ম ও দুর্নীতি অস্বীকার করেন তিনি। এমনকি নিউজ না করার জন্য অনৈতিক লেনদেনের প্রস্তাবও দেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁওয়ের সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, জবাবদিহি ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়াচ্ছেন। এবিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে এগিয়ে আসতে হবে এবং যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে ধীরে ধীরে সরকারি দপ্তরগুলোতে দুর্নীতি কমে আসবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক জানান, সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের যে নিয়মনীতি আছে তা মেনে চলার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও জেলা পর্যায়ে কোনো অনিয়ম ঘটলে দুদক তা মনিটরিং করে ব্যবস্থা নেবে। এই বিষয়ে দুদকের কোনো কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর