দেশের মোবাইল অপারেটর গুলোর বিরুদ্ধে কারো অগোচরে তার আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে ভিন্ন সিম নিবন্ধনের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন অভিযোগে ও অভিযানে উদ্ধার হওয়া সিম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এসব সিমের বেশীর ভাগই ব্যবহৃত হয় অপরাধ মূলক কর্মকান্ড ও ভিওআইপি কারবারে৷ আর এসব অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর দাবীদার গ্রামীণ ফোন।
এবার চট্টগ্রাম নগরীর এক গ্রাহকের নাম, ঠিকানা ব্যবহার করে অন্য কোন ব্যক্তি না চক্রকে ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিভাইস ব্যবহারের অনৈতিক সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে গ্রামীণ ফোনের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালী থানায় বিস্তারিত উল্লেখ করে একটি সাধারণ ডায়রি (তারিখ-৩১ জুলাই, জিডি নং-২৬৮১) করার পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে অভিযোগ জানিয়েছে (অভিযোগ ট্রেকিং নং ccms2026 - 1430619154558) ।
ভূক্তভোগী কামরুজ্জামান খান (রনি) পেশায় একজন সাংবাদিক৷ চট্টগ্রামে এই বাসিন্দা নিশ্চিত ভাবে জানতে পারেন তাঁর নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে জিপিফাই নামক গ্রামীণ ফোনের ইন্টারনেট সংযোগটি অন্য কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে সরবরাহ করেছে গ্রামীণ ফোন কর্তৃপক্ষ৷ তিনি আশংকা করছেন উক্ত জিপিফাই ইন্টারনেট সংযোগটি অবৈধ ভিওআইপি কিংবা রাষ্ট্র বিরোধী কোন কাজে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ৷
ভুক্তভোগী জানান, জুলাই মাসের ২৬ তারিখ থেকে অদ্যবদি এই বিষয়ে গ্রামীণ ফোন কর্তৃপক্ষের সাথে বার বার যোগাযোগ করেও কোন প্রকার সুরাহা না পেয়ে নিজের নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকার ক্ষুন্নের অভিযোগ তুলে তিনি থানায় জিডি ও ভোক্তা অধিকারে অভিযোগটি করেছেন৷ এমন ভোগান্তি ও মানসিক হয়রানির ন্যয় বিচার পেতে তিনি উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান৷
থানার জিডি ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে করা অভিযোগ থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বাসিন্দা, কামরুজ্জামান রনি দেশের অন্যতম শীর্ষ নিউজ পোর্টাল বিডি২৪লাইভ এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হিসেবে দ্বায়িত্বরত আছেন৷ তিনি তাঁর গ্রামীণফোন মোবাইল নাম্বারের সাহায্যে মাইজিপি এপস থেকে গত ২৩ জুলাই কোতোয়ালী থানাধীন কাজীর দেউরী এপলো শপিং সেন্টারের অবস্থিত অফিসের ঠিকানায় একটি জিপিফাই ইন্টারনেট সংযোগসহ ডিভাইস অর্ডার করেন৷ ২৬ জুলাই সর্বশেষ প্রাপ্ত দুটি এসএমএস এ তাঁকে জানানো হয় তাঁর পণ্যটির অর্ডার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং On the way অবস্থায় আছেন। অর্ডার মোতাবেক গ্রামীণ ফোনের তত্ত্বাবধানে উক্ত ডিভাইস ক্রেতার ঠিকানায় পৌছানো ও ইন্সটলেশন করে দেয়ার কথা৷ কিন্তু দুইদিন পার হয়ে যাওয়ার পরও জিপিফাই ডিভাইসটি ক্রেতা কামরুজ্জামান রনির কাছে এসে না পৌছানোয় তিনি জিপিফাই হট লাইন নাম্বার ০১৭৬৬৬৬৯৯৯৯ এ কল করলে তাঁকে জানানো হয় ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগটি ইতিমধ্যেই তাঁর ঠিকানায় ডেলিভারি করা হয়েছে এবং সেটির সংযোগ ব্যবহার শুরু হয়েছে৷ এমন উদ্ভট জবাবে ক্রেতা কামরুজ্জামান রনি বিষ্মিত হন। এবং গ্রামীণ ফোনের কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধিকে জানান তিনি কোন ডিভাইস রিসিভই করেন নাই৷ এসময় জিপিফাই হটলাইন নাম্বারটি থেকে জানানো হয় বিষয়টি এক্সপার্ট টিমের কাছে অভিযোগ আকারে জানানো হচ্ছে, দ্রুত এই সমস্যা সমাধান হবে। ২৬ জুলাই রাতে ভুক্তভোগীকে গ্রামীণ ফোনের ১২১ নাম্বার থেকে কল করে বিস্তারিত অভিযোগটি আবারও শোনা হয় এবং আবারও অভিযোগ আকারে এক্সপার্ট টিমের কাছে জানানো হচ্ছে বলে দায়সারাভাবে জবাব দেয়া হয়৷ অথচ তখনো কামরুজ্জামান রনি তার মাইজিপি এপস থেকে দেখতে পাচ্ছেন কে বা কাহারা তার নামে অর্ডার করা ইন্টারনেট ডিভাইস ও সংযোগে বেশ বড় ভলিউমে ডাটা ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে যা সচরাচর সাধারণ কোন ক্রেতা করার কথা নয়৷
সর্বশেষ ৩০ জুলাই পর্যন্ত গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে আর কোন সাড়া না পেয়ে ক্রেতা নিজেই গ্রামীণ ফোন কাস্টমার কেয়ার নাম্বার ১২১ এ যোগাযোগ করেন৷ ইতিমধ্যে কামরুজ্জামান রনির নাম ও ঠিকানায় ব্যবহার করে ব্যবহৃত ইন্টারনেট সংযোগটিতে মাত্র কমেকদিনে বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ব্যবহার হচ্ছিলো যা তার মাইজিপি এপসে বিস্তারিত দেখা যাচ্ছিলো। ভূক্তভোগী পেশায় একজন সাংবাদিক হওয়ায় উক্ত সংযোগে এতো বিপুল পরিমাণ ডাটা ব্যবহার দেখে আশংকা করেন ডিভাইসটি ভিওআইপি বা অবৈধ কোন ডাটা পরিবহন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে তিনি গ্রামীণ ফোন কাস্টমার কেয়ার ১২১ নাম্বারে দ্বায়িত্বশীল কাউকে কথা বলার অনুরোধ করলে কথিত এক্সপার্ট টিম থেকে জনৈক তমাল পুরো বিষয়টি আবারো অবগত হন এবং বিষয়টি সমাধানে দুই ঘন্টা সময় চেয়ে নেন৷ দুই ঘন্টা পর উক্ত জনৈক তমাল ভুক্তভোগী কামরুজ্জামান রনিকে ১২১ নাম্বার থেকে কল করে বলেন, "আমাদের এক্সপার্ট টিম এটি নিয়ে কাজ করছে। আমাদের কোথাও ভুল হয়েছে অথবা আমাদেরই কেউ অসাধুপায় অবলম্বন করে আপনার ডিভাইসটি অন্য কোথাও বিক্রি করে দিয়েছে।" (এই সংক্রান্ত সকল ফোনালাপ কামরুজ্জামান রনির কাছে সংরক্ষিত আছে)। সর্বশেষ উক্ত তমাল একাধিকবার কামরুজ্জামান রনিকে ১২১ নাম্বার থেকে কল করে বলে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যেই সমস্যাটি সমাধান হয়ে যাবে৷ তাদের লোকাল টিম দ্রুত ক্রেতার সাথে যোগাযোগ করবে।
ভূক্তভোগী আক্ষেপ করে জানান, ৩০ জুলাই রাত ১২টা পর্যন্ত গ্রামীণ ফোন থেকে কোন সমাধান ও কল তিনি পাননি৷ এবং এই রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত তার নাম ঠিকানা ব্যবহার করে কে বা কারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেই আচ্ছেন৷ এমন পরিস্থিতিতে তিনি মানসিক ভাবে প্রচন্ড চাপে পড়েন৷ পরবর্তিতে এই সংক্রান্তে কোতোয়ালী থানায় লিখি জিডি করার পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ জানান৷ কামরুজ্জামান রনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি একজন গণমাধ্যম কর্মী তার ওপর চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রে বসবাস করছি৷ আমার সাথে যদি এমন অপকর্ম গ্রামিণফোন করতে পারে তাহলে দেশের প্রত্যন্ত এলাকার সহজ সরল মানুষের নাম ঠিকানা এমন কি ফিংগার প্রিন্ট ব্যবহার করে ভিওআইপি ব্যবসা থেকে শুরু করে নানান অপকর্ম করাটা অস্বাভাবিক নয়৷ যদি কেউ অবৈধ কাজে আমার নামে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে ব্যবহার করে রাষ্ট্র বিরোধী কোন কাজে সেটা ব্যবহার করে তাহলে সেই দ্বায় আমার ওপরও আসতে পারে৷ তাই আমি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি৷ এই কয়েকদিন আমি যে মানসিক চাপে পড়েছি তা অবর্ণনীয়।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে আবারও অবৈধ ভিওআইপি কারবারে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বিটিআরসি'র নোটিশে বলা হয়, গ্রামীণফোন নিজস্ব নেটওয়ার্কে অবৈধ কল প্রতিরোধে বাধ্যতামূলক সেলফ-রেগুলেটরি প্রসেস এবং টেলিকম ফ্রড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। এতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, সেলুলার মোবাইল সার্ভিসেস গাইডলাইন এবং অপারেটরের লাইসেন্সের একাধিক শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে। সম্প্রতি কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার একটি মামলার অভিযানে ১৬৪টি এবং চট্টগ্রামের হালিশহর থানার আরেকটি মামলার অভিযানে ২০টি সিম জব্দ করা হয়, যেগুলোতে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম চলছিল। বিটিআরসির হিসাবে, প্রতি অবৈধ সিমের জন্য ১০ হাজার টাকা হারে মোট ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে এক অভিযানে অপারেটরটির ১ হাজার ৬৪০টি সিম উদ্ধার করা হয়। ২০২২ সালেও অবৈধ ভিওআইপির কারণে তাদের ৯৯ লাখ ৬২৫ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগেও অবৈধ ভিওআইপি কারবারের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির জন্য অভিযুক্ত হয় গ্রামীণফোন। সে সময় সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে ২০০ কোটি টাকা জরিমানা করে।।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর