একটি জিপিএ-৫। একটি পরিবারের বহুদিনের স্বপ্ন। ফল প্রকাশের দিন ঘরজুড়ে থাকার কথা ছিল হাসি-আনন্দ, মিষ্টি বিতরণ আর স্বজনদের শুভেচ্ছা। কিন্তু কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মানরা গ্রামের একটি ঘরে এবার ঠিক তার উল্টো চিত্র। সেখানে জিপিএ-৫-এর খবর যেন আনন্দের বদলে প্রিয় সন্তানকে হারানোর ক্ষতটাকেই আরও গভীর করে দিয়েছে।
শাহরিয়ার হোসেন শিহাবের বয়স মাত্র ১৭ বছর। এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ঢাকা বিমানবন্দর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়ে সে পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫। অথচ এই সাফল্যের খবরটি শোনার জন্য সে আর বেঁচে নেই। ফল প্রকাশের মাত্র দুদিন আগে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে মেধাবী এই শিক্ষার্থী।
সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। ফলাফলে শিহাবের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও তার বাড়িতে দেখা যায় শোকের ছায়া। যে ঘরে স্বজনদের ভিড় হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবল শিহাবকে হারানোর বেদনা আর স্মৃতি।
শিহাব কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের মানরা গ্রামের গাজীর বাড়ির মো. তফাজ্জল হোসেনের বড় ছেলে। পরিবারের সঙ্গে গাজীপুরে বসবাস করত সে। দুই সন্তানের মধ্যে শিহাব ছিল বড়। বাবা তফাজ্জল হোসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চাচার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পরিবারের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল শিহাব। ৮ আগস্ট ছিল তার চাচার বৌভাতের অনুষ্ঠান। সেদিন দুপুরে গোসল শেষে বাড়ির ছাদে ভেজা কাপড় শুকাতে দিতে যায় সে। ছাদের কার্নিশে কাপড় নাড়ার সময় ডেকোরেশনে ব্যবহৃত ছেঁড়া মরিচবাতির তারে জড়িয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় শিহাব। একপর্যায়ে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায় সে।
গুরুতর আহত শিহাবকে দ্রুত উদ্ধার করে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একটি পরিবারের আনন্দের অনুষ্ঠান মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের ঘটনায়।
শিহাবের চাচা জিয়াউল হক কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, শিহাব অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। সে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাবে—এমন প্রত্যাশা আমাদের সবারই ছিল। কিন্তু ফল প্রকাশের মাত্র দুদিন আগে আমরা ওকে হারিয়ে ফেললাম। শিহাব বেঁচে থাকলে আজ বাড়িটা খুশিতে ভরে উঠত। সবাই তাকে নিয়ে আনন্দ করত, মিষ্টি খাওয়াত। কিন্তু সেই জিপিএ-৫-এর খবরই এখন আমাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওর এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবে না।
শিহাবের মামা মিজানুর রহমান আখন্দ বলেন, আমাদের পরিবারের ভাই-বোনদের মধ্যে প্রথম সন্তান ছিল শিহাব। আমি তাকে একটু বেশি আদর করতাম। ওর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত এখন স্মৃতি। তাকে মনে করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে বহুকাল, হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। গভীর শোক নিয়ে এই পথচলা যে কতটা কষ্টের, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
স্বজনদের চোখে এখন বারবার ভেসে উঠছে শিহাবের হাসিমুখ, তার স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের নানা পরিকল্পনা। যে ছেলেটি এসএসসির ফল হাতে নিয়ে নতুন স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই ছেলেটিই এখন কেবল স্মৃতি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্নি ইসলাম বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমরা পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
শিহাবের কাঙ্ক্ষিত ফল এসেছে। কিন্তু সেই ফল হাতে নেওয়ার মতো মানুষটি আর নেই। তাই অন্য সব শিক্ষার্থীর কাছে জিপিএ-৫ যেখানে নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দিয়েছে, শিহাবের পরিবারের কাছে সেই জিপিএ-৫ এখন হয়ে উঠেছে প্রিয় সন্তানকে হারানোর এক নির্মম স্মারক।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর