• ঢাকা
  • ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৪ সেকেন্ড পূর্বে
মো. নূর আলম
গোপালপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:৫৯ দুপুর

যমুনার তীরে বেহুলা ভাসান, লোকবিশ্বাস ও বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের এক জীবন্ত আয়োজন

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

বেহুলা ভাসান বা শ্রাবণের ডালা ভাসান কেবল একটি লোকাচার নয়; এটি বাংলার লোকবিশ্বাস, মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনি, নদীমাতৃক জীবন এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিফলন। সময়ের পরিবর্তনে বাংলার অনেক প্রাচীন লোকাচার হারিয়ে গেলেও মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও সাংস্কৃতিক চর্চার ধারাবাহিকতায় এখনো টিকে আছে বেহুলা ভাসানের ঐতিহ্য।

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার শাখারিয়া এলাকায় প্রতিবছর শ্রাবণ মাসের শেষ দিকে যমুনা নদীর তীরে এ আয়োজন ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

দূর-দূরান্ত থেকে সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ ছুটে আসেন এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন দেখতে। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরাও এতে অংশ নিয়ে বাংলার লোকসংস্কৃতির এই অনন্য ধারাকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পান। লোকাচার অনুযায়ী, কলাগাছ ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয় ছোট ভেলা বা ডালা। ফুল, ফল, প্রদীপসহ নানা উপকরণ দিয়ে সেটি সাজানো হয়। এরপর গান, কাহিনি, লাচারি ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় ডালা। লোকবিশ্বাসে এই আয়োজনের সঙ্গে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি, মনসাদেবীর আরাধনা, মঙ্গলকামনা এবং মানুষের নানা আশা-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক রয়েছে। মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা চরিত্র বাংলার লোকসাহিত্যে এক অনন্য প্রতীক। স্বামী লখিন্দরের জীবন রক্ষায় বেহুলার দীর্ঘ সংগ্রাম, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আত্মত্যাগের কাহিনি যুগের পর যুগ ধরে বাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। সেই কাহিনিকে ঘিরে গড়ে ওঠা বেহুলা ভাসান আজ লোকসাহিত্য ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে নদীভিত্তিক জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করেছে। শাখারিয়ায় বেহুলা ভাসানের অন্যতম আকর্ষণ ‘বেহুলা লাচারি’।

স্থানীয় শিল্পীরা লাচারি গান, অভিনয়, কাহিনি ও সংলাপের মাধ্যমে বেহুলা-লখিন্দরের উপাখ্যান তুলে ধরেন। নদীর তীরে লোকজ বাদ্যযন্ত্র, গান ও অভিনয়ের আবহে সৃষ্টি হয় এক ভিন্নমাত্রার সাংস্কৃতিক পরিবেশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পরিবেশনা স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

এবারও শ্রাবণের শেষে যমুনা নদীর তীরে অনুষ্ঠিতব্য বেহুলা ভাসানকে ঘিরে সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। এরই ধারাবাহিকতায় শাখারিয়া বেহুলা লাচারি দলের আয়োজনে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিনিধি এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক ড. কামাল উদ্দিন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন শাখারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আনজু আনোয়ারা ময়না এবং কালিদাস রক্ষিতসহ সংশ্লিষ্টরা।

আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেহুলা ভাসানকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। আধুনিক বিনোদনের বিস্তারের কারণে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির অনেক ধারা যখন মানুষের জীবন থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, তখন শাখারিয়ার এই আয়োজন ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গবেষকদের কাছেও শাখারিয়ার বেহুলা ভাসানের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।

এখানে একই সঙ্গে লোকসাহিত্য, লোকবিশ্বাস, নদীকেন্দ্রিক জীবন, অভিনয়, সংগীত, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানুষের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ফলে এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তন বোঝার একটি জীবন্ত ক্ষেত্র। একটি ডালা যখন যমুনার স্রোতে ভেসে যায়, তখন তার সঙ্গে যেন ভেসে চলে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, বিশ্বাস ও আবেগ। আবার সেই স্রোতই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় বাংলার শেকড়ের গল্প। তাই বেহুলা ভাসান শুধু নদীর পানিতে একটি ডালা ভাসিয়ে দেওয়ার আয়োজন নয়; এটি বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক আবেগঘন সাংস্কৃতিক প্রয়াস।

নদী ও মানুষের সম্পর্ক যেমন প্রাচীন, তেমনি বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গেও নদীর রয়েছে গভীর যোগসূত্র। যমুনার তীরে শাখারিয়ার বেহুলা ভাসান সেই সম্পর্কেরই এক অনন্য স্মারক। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সংস্কৃতির শেকড় যে এখনো কতটা গভীরে প্রোথিত, বেহুলা ভাসানের আয়োজন তারই জীবন্ত প্রমাণ।

বাপ্পি/সা.এ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]