প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকলেও সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। সংবিধান অনুযায়ী অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
তবে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের মতো কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা রয়েছে। সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণে বাধ্য নন।
দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা
রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করার ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করতে পারেন।
সাংবিধানিক দায়মুক্তি
দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না। তবে সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের সুযোগ রয়েছে।
মেয়াদ ও যোগ্যতা
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন। রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালে তিনি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য নন। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি হতে হলে বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হয় এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
বেতন ও সরকারি সুবিধা
রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা আয়করমুক্ত। সরকারি বাসভবন হিসেবে রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে বঙ্গভবন। এর রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।
সরকারি কাজে যাতায়াতের জন্য গাড়ি ও অন্যান্য পরিবহন সুবিধা পান রাষ্ট্রপতি। বিদেশ সফরে সরকার নির্ধারিত হারে ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য দেশের যেকোনো হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসার সুবিধা রয়েছে। প্রয়োজনে চিকিৎসকদের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার ব্যয়ও সরকার বহন করে।
রাষ্ট্রপতির জন্য বছরে দুই কোটি টাকা স্বেচ্ছাধীন তহবিল রয়েছে। বিমানভ্রমণের জন্য বছরে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বিমাসুবিধার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ছাড়া আপ্যায়ন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্যও নির্ধারিত সুবিধা রয়েছে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির পদটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলেও সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অধিকাংশ নির্বাহী দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের কাঠামোর মধ্যেই পালন করতে হয়।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর