রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ তার পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনার বর্ণনায় আসামিরা নতুন তথ্য দিয়েছে। আদালতে তাদের দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকে বাসার ছাদে হত্যা করার কথা জানিয়েছে। তিনজনকে হত্যার পর সবশেষ দোতলায় ঘরের ভেতরে ঢুকে ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যা করে তারা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে আদালতের বিশ্বস্ত সূত্র, তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
যদিও এর আগে রোববার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন আসামিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে উনাদের ছাদে আসে। ছাদে আসে বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে। এই দুজন ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিরা জানিয়েছে- প্রার্থী চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
এদিকে আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছে, ঘটনার দিন শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোররাতে তারা পাশের বাসার ছাদ থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার দোতলার ছাদে যান। সেখানে তারা পানির ট্যাঙ্কির পাশে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। এর মধ্যে ভোর (সূর্যের আলো) হয়ে যায়। হঠাৎ সেখানে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী উপস্থিত হয়ে তাদের মাদক সেবনে বাধা দেন। এ সময় তারা দুজন মিলে শিক্ষক গণপতিকে তার সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর মরদেহ ছাদের এক কোণায় রেখে টিন দিয়ে ঢেকে দেয়।
এই হত্যাকাণ্ডের সময় শিক্ষক গণপতির সাথে তাদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে এবং তিনি চিৎকার করার চেষ্টা করেন। টিনের শব্দ পেয়ে বা যে কোনোভাবে ছাদে উঠে আসেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। এ সময় মুগ্ধ সেই গামছা দিয়ে প্রীতিলতার গলা পেঁচিয়ে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন।
প্রীতিলতাকে মারার পর দুইজনে মিলে পাশে থাকা রশি ও গামছা পেঁচিয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পাশের ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়, সেজন্য সেখান থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে এনে রেখে দেন তারা।
এরপর নিচে নেমে এলে ঘুম থেকে জেগে উঠে বিছানায় বসে থাকতে দেখেন আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে। তখন প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। বাড়িতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে সন্দেহে নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ। এসব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে দুজনে সেখানে গোসল করেন এবং সেখানে বসে আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন। এছাড়া খেজুর ও শসাও খান তারা।
সূত্র বলছে, আসামিরা এ ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ডাকাতির ঘটনা সাজায়। ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে। পরে বাড়িতে থাকা কিছু স্বর্ণ এবং ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যান দুইজন। ১৫ হাজার টাকা নেন মুগ্ধ। সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে ওই স্বর্ণ মাটিতে পুঁতে রাখেন সিদ্ধার্থ, যা পূর্ণিমা জানতেন না। পেশায় স্বর্ণ কারিগর সিদ্ধার্থ দাস ওই বাসায় গহনা বের করে আগুন ধরিয়ে তা পরীক্ষাও করে দেখে।
প্রসঙ্গত, রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এরপর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর আগে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন তিনি।
গত শনিবার রাতে বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার হয়। তাদের সবাইকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।
পরে দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিআইজি) আবদুল মাবুদ জানান, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।
বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর