নেপাল ও চীনের তিব্বতে শত শত মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে ওঠা ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়েছে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে কয়েকশ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার পর। এরপর বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত নেমে এসে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
বৃহস্পতিবারও নেপালের দুর্গম উপত্যকা ও পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। দেশটিতে এখনো এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
হিমবাহের ওই অংশটি ঠিক কী কারণে ভেঙে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নেপালের কর্মকর্তারা প্রথমে ওই অঞ্চলে অনুভূত একটি ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানায়, যে কম্পনটি রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের বরফ ও শিলা ধসে সৃষ্ট ভূকম্পনীয় শক্তি এবং পরবর্তী ধ্বংসাবশেষের স্রোতের ফল।
স্যাটেলাইট চিত্রেও হিমালয়ের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২৪ আগস্টের ছবির সঙ্গে ২৬ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করে দেখা যায়, হিমবাহের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং সেখানে বিশাল ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ জমেছে।
এরপর বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পাহাড়ি লেন্দে খোলা নদীর দিকে নেমে আসে। সেই ধ্বংসাবশেষের স্রোত তিব্বতের গিরং বন্দরে আঘাত হানে এবং নেপালেও প্রবেশ করে। এর ফলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যার পানির প্রবল স্রোতে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও গ্রাম ভেসে যায়।
সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, বিশাল বাদামি রঙের কাদার স্রোত পাহাড়ি গিরিখাত দিয়ে দ্রুত নেমে এসে গিরং বন্দরের ভবন ও সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করা মানুষকে গ্রাস করছে। যাচাই করা ভিডিওতেও সীমান্ত এলাকায় বহু মানুষকে পানির স্রোতে ভেসে যেতে দেখা গেছে।
চীনা সরকারের ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেং জানিয়েছেন, হিমবাহের বরফ ও শিলা ধসে তৈরি ধ্বংসাবশেষের স্রোত ঘণ্টায় প্রায় ৫০ মিটার বা সেকেন্ডে ৫০ মিটার গতিতে এগিয়েছে। এটি ২০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা অতিক্রম করেছে। ফলে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য খুব সামান্য সময়ই পাওয়া গেছে।
হিমালয় থেকে নেমে আসা ওই পানির স্রোত নেপালের বিভিন্ন উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি ভাটির দিকে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করেছে। হিমালয়ের উচ্চতা থেকে ভারতের সীমান্তসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মিটার উচ্চতা কমে যাওয়ার পথে পানির গতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে, বন্যায় পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে দুর্যোগের পূর্ণ মাত্রা এখনো স্পষ্ট নয়।
বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল নেপালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বলেন, ‘বিশাল এক কাদার ঢল সরাসরি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেটি আরও উঁচু হচ্ছিল। আমাদের ঘরে কাদা ঢুকে পড়তে দেখে আমি স্ত্রীকে হাত ধরে ছাদে নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কাদার স্রোতে তিনি ভেসে যান।’
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা ICIMOD জানিয়েছে, আকস্মিক বন্যায় পানি, পলি ও বিশাল পাথরের প্রবল স্রোত ভুটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নেমে আসে। ভাটির গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায় বলে স্থানীয়ভাবে খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও শিলাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এর ফলে এ ধরনের হিমবাহ ধস ও ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে বুধবারের হিমবাহ ধসের তাৎক্ষণিক ও একমাত্র কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করতে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়া অবশ্যই ভূমিকা রাখতে পারে। উষ্ণতা বাড়লে পাহাড়ের খাড়া ঢালে বরফের সহায়তা কমে যেতে পারে, গলিত পানির পরিমাণ বাড়তে পারে এবং জমাট বাঁধা, গলা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। এসব কারণে কিছু এলাকায় পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি বাড়ে।
এদিকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে নেপাল ও চীন। সীমান্তের দুই পাশে সৃষ্ট দুটি হ্রদ যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হিমালয় অঞ্চলে নতুন করে এই হ্রদ দুটির পানি উপচে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর