সাড়ে তিন মাস। এই দীর্ঘ সময়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম খান একদিনের জন্যও কর্মস্থলে পা রাখেননি। অথচ একই সময়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অন্তত ১৫টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ফার্মেসিতে নিয়মিত বসছেন তিনি। দেখছেন রোগী, নিচ্ছেন ফি- কোথাও ৫০০ টাকা, কোথাও দুই হাজার।
সরকারি চাকরির নিয়ম বলছে, বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কর্তৃপক্ষ দুই দফা শোকজ করেছে তাকে। কিন্তু জবাব দেননি ডা. শামসুল। বরং বদলি বাগিয়ে নিতে ঘুরছেন মন্ত্রী-এমপি আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের দুয়ারে দুয়ারে।
গল্পের শুরু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে নিউরো সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন তিনি। গত বছরের ১ নভেম্বর অপারেশন থিয়েটারে অ্যানেস্থেসিওলজি বিভাগের এক নারী রেসিডেন্ট চিকিৎসকের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রতিবাদে সহকর্মী চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা হাসপাতালের ভেতরেই বিক্ষোভ মিছিল বের করেন, বন্ধ করে দেন অস্ত্রোপচার কক্ষের সেবা। জরুরি বৈঠক ডেকে বিভাগ তাকে সাংগঠনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়। এর তিন দিনের মাথায়, ৪ নভেম্বর, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিবের সইয়ে তাকে বদলি করা হয় দিনাজপুরে।
ডা. শামসুল অবশ্য এই পুরো ঘটনাকে বলছেন ষড়যন্ত্র। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) আজীবন সদস্য হওয়ার কারণেই মিথ্যা অভিযোগে তাকে সরানো হয়েছে।
দিনাজপুরে বদলির পর প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত অফিস করলেও চলতি বছরের ১৯ মে-র পর থেকে আর কর্মস্থলমুখো হননি তিনি। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইস প্রিন্সিপাল ডা. মো. সরওয়ার মোর্শেদ আলম বলেন, সর্বশেষ ১৯ মে তিনি কলেজে এসেছেন। এরপর দুই দিনের ছুটি নিয়ে আর আসেননি। এই কারণে ১২ ও ১৮ আগস্ট দুইবার শোকজ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি জবাব দেননি।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. শেখ সাদেক আলী বলেন, নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণে তার বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। আমি বহুবার মুঠোফোনে তাকে কর্মস্থলে যোগ দিতে অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি বারবার অসুস্থতার অজুহাত দেখান।
অথচ এই 'অসুস্থতা' নিয়েই কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে খুলে বসেছেন ১৫টি চেম্বার। এর মধ্যে ১৩টি কক্সবাজার শহর, মহেশখালী, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া ও পেকুয়ায়। তালিকায় আছে টেকনাফের ইনোভা হেলথ কেয়ার, টেকনাফ মেডিকেল সেন্টার, কেয়ার ল্যাব; উখিয়ার কোর্টবাজার ডিজিটাল হাসপাতাল; পেকুয়ার নুর হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার; মহেশখালীর নিউরন হেলথ; কক্সবাজার শহরের জেনারেল হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, জমজম হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক ও অলিম্পাস হাসপাতাল। এমনকি মহেশখালীর উত্তরা ও নাহার ফার্মেসিতেও বসেন তিনি।
নিজের জন্মস্থান মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নের মিজ্জিরপাড়ায় রোগীপ্রতি নেন ৫০০ টাকা, আর অন্য চেম্বারগুলোয় ফি ওঠে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত।
জিজ্ঞাসা করা হলে ডা. শামসুল গণমাধ্যমে বলেন, 'আমি অফিসের সময়ে চেম্বার করি না। বেলা দুইটার পর করি। মানুষের দ্বারগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতেই জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগী দেখছি। প্রতি মাসে দুদিন করে পেকুয়া, মহেশখালী, উখিয়া, টেকনাফ ও চকরিয়ায় বসি, চট্টগ্রামেও দুদিন। বাকি সময় কক্সবাজার শহরে।'
তবে অসুস্থতার প্রসঙ্গে নিজেই বলেন, 'আমার বয়স হয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে আক্রান্ত। অতদূরে চাকরি করা সম্ভব না। তাই কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে আসার চেষ্টা করছি।'
ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে বদলি হয়ে গেছে দশ মাস, কিন্তু এখনো নিজেকে সেখানকার চিকিৎসক হিসেবেই পরিচয় দেন তিনি। ফেসবুকে, পত্রিকার বিজ্ঞাপনে, এমনকি প্রেসক্রিপশনের সাইনবোর্ডেও। কেন এখনো এই পুরোনো পরিচয় বহন করছেন, জানতে চাইলে তার সংক্ষিপ্ত জবাব, 'আসলে গ্রাফিক্সগুলো পরিবর্তন করা হয়নি। দ্রুত বদলে ফেলব।'
দুই দফা শোকজের জবাব না দেওয়াকে ডা. শামসুল দেখছেন কৌশল হিসেবে। তার ভাষ্য, যদি জবাব দিতাম, তবে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতাম না। এখন কর্তৃপক্ষ যে ব্যবস্থাই নিক, তার বিরুদ্ধে আমি আইনি সুরক্ষা নিতে পারব।
বেতন বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, 'বদলি হয়ে গেলে তখন বেতনের জন্য আবেদন করব। ২৮ বছর চাকরি করছি, অনেক ছুটি পাওনা আছে। সেই ছুটির বিপরীতেই বেতন-ভাতা চাইব।'
দিনাজপুর ছেড়ে কক্সবাজারে ফিরতে মরিয়া ডা. শামসুল। তার ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, মূলত প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুবিধার্থেই এই তদবির। নিজেই স্বীকার করেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য মাহফুজ উল্লাহ আলমগীর ফরিদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তিনি।
তার দাবি, তারা কথা দিয়েছেন, দেশের অবস্থা আরেকটু ভালো হলেই বদলির ব্যবস্থা করবেন। আমি সেই আশাতেই আছি।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। সংসদ সদস্য মাহফুজ উল্লাহ আলমগীর ফরিদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নই, কাজেই আমার সুপারিশের প্রশ্নই আসে না। আর আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। একই সুরে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব মু. হাসনাত মোর্শেদ ভূঁইয়াও। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন কোনো সুপারিশ করেননি।
অর্থাৎ যে দুই নাম ভাঙিয়ে বদলির আশ্বাস দাবি করছেন ডা. শামসুল, তারা নিজেরাই অস্বীকার করছেন এমন কোনো সংশ্লিষ্টতা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি বেতন বন্ধ, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, দুই দফা শোকজ, তবু থামছে না বেসরকারি চেম্বার-বাণিজ্য আর বদলির তদবির। ডা. শামসুল ইসলাম খানের এই দ্বৈত অস্তিত্ব রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জবাবদিহিতা আসলে কতটা কার্যকর, আর একজন সরকারি চিকিৎসকের অনুপস্থিতি কর্তৃপক্ষের নজরদারির বাইরে কতদিন টিকে থাকতে পারে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর