ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নাম নিজের নামে পরিবর্তন করার প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘আপনি প্রেসিডেন্ট, কোনো পাগল রাজা নন।’
২ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, হরমুজ প্রণালি এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকায় এর নাম ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ করা উচিত কি না। এর পরদিন স্যান্ডার্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এর জবাব দেন।
স্যান্ডার্স বলেন, আমেরিকান জনগণ হরমুজ প্রণালির নাম ট্রাম্পের নামে পরিবর্তন চায় না। বরং তারা চান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করা হোক। তাঁর দাবি, এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৫ দশমিক ৬৯ ডলার এবং পেট্রলের দাম ৪ দশমিক ১২ ডলারে উঠেছে।
স্যান্ডার্সের ভাষায়, ‘আপনি প্রেসিডেন্ট, কোনো পাগল রাজা নন। সেভাবেই আচরণ করুন।’
কেন ‘পাগল রাজা’ উপমা?
স্যান্ডার্সের বক্তব্যে ‘ম্যাড কিং’ বা ‘পাগল রাজা’ শব্দবন্ধটি ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় জর্জের ঐতিহাসিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমেরিকান বিপ্লবের সময় তৃতীয় জর্জ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আমেরিকান উপনিবেশগুলোর বিদ্রোহ দমন করতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৭৮৩ সালে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা স্বীকার করে।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, তৃতীয় জর্জকে কেবল ‘পাগল রাজা’ হিসেবে দেখলে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের জটিল বাস্তবতা আড়াল হয়। জীবনের শেষদিকে তিনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগলেও কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। এ কারণে তাঁকে ‘ফার্মার জর্জ’ নামেও ডাকা হতো।
মার্কিন ইতিহাসবিদ রিক অ্যাটকিনসন এর আগে তৃতীয় জর্জ ও ট্রাম্পের তুলনা করে আরও তীব্র মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘ট্রাম্পের তুলনায় তৃতীয় জর্জ আব্রাহাম লিংকনের মতো।’ অ্যাটকিনসনের বক্তব্য ছিল, আমেরিকান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তৃতীয় জর্জকে যে অত্যাচারী শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, ঐতিহাসিক বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
হরমুজ প্রণালির নাম বদলানো কতটা সম্ভব?
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহনপথ। ট্রাম্পের ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ প্রস্তাবকে মূলত রাজনৈতিক ও প্রতীকী বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো জলপথের নাম যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে পরিবর্তন করতে পারে না।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, ইরান প্রণালিটি বন্ধ থাকার কথা বলছে এবং তেহরানের নির্দেশনা অমান্যকারী জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে।
এ পরিস্থিতিতে স্যান্ডার্সের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—যুদ্ধ, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সংকটের সময়ে প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাধান; নিজের নাম কোনো ঐতিহাসিক জলপথের সঙ্গে যুক্ত করা নয়। তাঁর ‘পাগল রাজা’ মন্তব্যটি তাই শুধু ট্রাম্পকে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাও হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: CNN, Reuters/CNA, Benzinga, Irish Times
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর