রাজধানীর রামপুরায় ‘ডেলটা হেলথ কেয়ার’ হাসপাতালে এক বছর আগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর শরীরে পুশ করার ঘটনা ঘটেছে। আর এই ওষুধটি বিক্রি করা হয় হাসপাতালের ফার্মেসি থেকেই। এতে হাসপালটির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে রোগী ও সাধারণ মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ৯ মাস ২৩ দিন বয়সী এক শিশুকে গত ৬ সেপ্টেম্বর ডেল্টা হেলথ কেয়ারে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসি থেকেই ওষুধ কেনা হয়। নার্সরা চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী ওষুধও প্রয়োগ করেন শিশুটির শরীরে। পরে শিশুটির অভিভাবকরা কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে তার জন্য ইনজেকশনের বোতলটি খুঁজে বের করেন। খুঁজে বের করার পর ওষুধের মোড়ক ও প্যাকেজিং পরীক্ষা করে দেখা যায়, ইনজেকশনটির মেয়াদ একবছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। তখন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহারের প্রমাণ মিলতেই হাসপাতালে ক্ষোভে ফেটে পড়েন রোগীর স্বজনরা।
মানি রিসিট এবং ওষুধের ছবি থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধটির নাম ‘এ্যাসিফিন’। যেটি কেবলমাত্র রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ব্যবহার্য ও বিক্রয়যোগ্য। আর এটি ইনজেকশনের মাধ্যেমে রোগীর শরীরে পুশ করা হয়। ‘এ্যাসিফিন’ ওষুধটির মোড়ক ও প্যাকেজিংয়ে উৎপাদনের মেয়াদ দেওয়া রয়েছে ২০২৩ সালের মে মাস এবং মেয়াদোত্তীর্ণর তারিখ দেওয়া রয়েছে ২০২৫ সালের আগস্ট মাস।
ভুক্তভোগী শিশুর মা কানিজ ফাতেমা ইতি বলেন, ‘ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়ার কারণে গত ৬ সেপ্টেম্বর আমার ছেলেকে ডেল্টা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করি। চিকিৎসকরা স্যালাইন দিচ্ছেন, ইনজেকশন দিচ্ছেন। এটা তো আসলে আমাদের দেখারও কথা না। প্রতিদিন সকালে একটি করে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে যায়। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে যে অ্যান্টিবায়োটিকটি দিয়েছে, ওটার অ্যাম্পুল ড্রয়ারে ছিল। গতকাল সারারাত বাচ্চা খুব ডিস্টার্ব করেছে। ফলে আমি সারারাত ঘুমাইনি। শেষ রাতে বাচ্চাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে জিনিসপত্রগুলো গুছানোর সময় তখন এটা আমার চোখে পড়ে। সেটা বের করে দেখি, গতকাল সকালেই ভুল ইনজেকশনটা দিয়ে গেছে, যেটা ডেট ফেল।’
তিনি বলতে থাকেন, 'তখন নার্সকে বললে, তিনি বলেন- ‘আমি দেই নাই’। এ সময় আমি চিকিৎসককে জানাতে বললে কেউই রেসপন্সিবিলিটি নেয়নি এবং কেউ কোনো কথাই বলেননি। তিন-চার ঘণ্টা ধরে বলার পরও তারা কোনো কিছুই করেনি। পরে আমার আত্মীয় সাকিনা আক্তার হাসপাতালের ম্যানেজারকে ফোন দেন।'
এ বিষয়ে সাকিনা আক্তার বলেন, 'ম্যানেজারকে ফোন দিয়ে বললাম যে, আপনি কি জানেন এমন একটা ঘটনা ঘটেছে? তিনি বলেন যে, ‘হ্যাঁ, আমি শুনেছি, আসতেছি। এসে কথা বলব।’ তখন আমি বলি, আপনি এসে কেন কথা বলবেন? আপনাদের যে ডাক্তারের আন্ডারে বাচ্চাটা ভর্তি, সেই ডাক্তারকে ফোন দিয়ে বলেন- এটার জন্য কী করতে হবে? সেই পদক্ষেপটা আপনারা নেন। আপনারা বসে আছেন কেন? এটা তো সমাধান করতে হবে, যাতে বাচ্চার শরীরে ব্যাড ইফেক্ট না করে, সেটার জন্য আপনারা কিছু করেন।’
তিনি বলতে থাকেন, ‘তখন ম্যানেজার ডাক্তারকে ফোন দেন। পরে বাচ্চাটিকে এনআইসিইউতে অবজারভেশনে রাখা হয়। কিছু টেস্ট করানোর পর রিপোর্টগুলো দেখে আমাদের বলেন, রিপোর্ট মোটামুটি ভালো, আপনাদের বাচ্চা নিয়ে টেনশন করার কিছু নাই।’
তিনি আরও বলেন, 'হাসপাতালটির মেডিকেল অফিসার আমাদের ডেকে বারবার বুঝাইতেছে যে, ‘২৪ ঘণ্টার বেশি যেহেতু হয়ে গেছে, এর মধ্যে কোনো ক্ষতি হয় নাই। আর কিছু হবে না, আপনারা এটা নিয়ে ঠান্ডা থাকেন, নিশ্চিন্ত থাকেন, এই-সেই।’ এই বাচ্চার না হয় ক্ষতি হয়নি, আল্লাহ বাঁচাইছে; কিন্তু যদি কিছু হয়ে যেত? ভবিষ্যতেও যে কিছু হবে না- এটার গ্যারান্টি কে দেবে? আর আমরা যখন হইচই করেছি এটা নিয়ে, তখন ফার্মেসি থেকে ওরা… ওদের মনে হয় মেয়াদোত্তীর্ণ আরও ওষুধ ছিল, সেগুলো বের করে সরিয়ে ফেলেছে।’
আপনাদের হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ একটি শিশুর শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে- বিষয়টি জানেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ‘ডেল্টা হেলথ কেয়ার’ হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. ফাউদুল ইসলাম বলেন, ‘আপনি হাসপাতালে আসেন, তখন এ বিষয়ে কথা হবে।’
এক বছর আগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি ও শিশুর শরীরে প্রয়োগের বিষয়ে হাসপাতালের ম্যানেজার জসিম বলেন, ‘আমাদের একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল, সেটা ঠিক হয়ে গেছে। একটা ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হতেই পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হয়।’
সেই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে ওষুধটি বিক্রি হলো কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনি হাসপাতালে এসে সরাসরি কথা বললে ভালো হয়। এছাড়া ঘটনার পর আমরা সার্চ করে দেখেছি, আমাদের মেয়াদোত্তীর্ণ আর কোনো ওষুধ নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার পর কীভাবে কী হলো- সেটি আমরা দেখছি।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আর ক্ষতি না করলেও রোগ নিরাময়ে তো সেটি কাজ করবে না। এখন ওষুধটি যদি প্রয়োগের পর কাজ না করে, তাহলে বলতে হবে কপাল ভালো। তবে যদি কিছু হয়ে যায় তখন?’
তিনি আরও বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ হাসপাতাল বা ফার্মেসিতে থাকবে কেন? এসব ওষুধ বিক্রি ও রোগীর শরীরে প্রয়োগ করা মারাত্মক অপরাধ। ঘটনা সত্যি হলে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কেউ যদি বলেন- মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থাকতেই পারে, সেটি সঠিক না। তাহলে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে- মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দিয়ে কী করেন আপনারা?’
রামপুরার ডেলটা হেলথ কেয়ারে এক বছর আগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি ও শিশুর শরীরে প্রয়োগের একটি ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না? এর জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘পুরো খোঁজ-খবর নিতে হবে। এই মুহূর্তে আমি ঢাকার বাইরে আছি। আসার পর বিষয়টি দেখছি। আপনি নক দিয়েন।’
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর