দারিদ্র্যের বেড়াজাল ভেঙে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমানো গাজীপুরের কালীগঞ্জের তরুণ ইউসুফ হাসান আলিফ (২৭) কফিনে বন্দী হয়ে নিজ ঠিকানায় ফিরেছেন। কাজের বৈধ অনুমতিপত্র পাওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় স্পেনের মাদ্রিদে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায় এবং বাদ জুমা পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
নিহত ইউসুফ হাসান আলিফ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। পরিবারের সুদিন ফেরাতে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ ও ধারদেনা করে প্রায় ২৯ লাখ টাকা খরচ করে গত জুন মাসে তাকে স্পেনে পাঠিয়েছিলেন বাবা। সেখানে তিনি মাদ্রিদের একটি বাইসাইকেল গ্যারেজের ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করতেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি তিনি স্পেনে কাজের বৈধ অনুমতিপত্র বা ‘ওয়ার্ক পারমিট’ লাভ করেছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটে যায় সর্বনাশা এক দুর্ঘটনা।
গত ৩০ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা জেলার মেট্রো পালোস দে লা ফ্রন্তেরা এলাকার কাইয়ে ক্যানারিয়াস সড়কের একটি বাইসাইকেল গ্যারেজে প্রতিদিনের মতো ফুড ডেলিভারির সাইকেল আনতে গিয়েছিলেন আলিফ। সে সময় হঠাৎ একটি ইলেকট্রিক বাইসাইকেলের ব্যাটারি বিস্ফোরিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে গ্যারেজে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে আলিফসহ তাঁর তিন সহকর্মী আটকা পড়েন। মৃত্যুর আগমুহূর্তে দম বন্ধ হয়ে আসার সময় সহকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আলিফের পাঠানো শেষ বার্তাটি ছিল— “আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।” তবে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও জীবন্ত অবস্থায় তাঁকে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনায় দগ্ধ অপর দুই সহকর্মী আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
এদিকে শুক্রবার সকালে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আলিফের মরদেহ ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ছেলের মরদেহ গ্রহণের জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষारত শোকে বিহ্বল বাবা আব্দুল মোতালিব কফিনটি বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ছেলের সাথে শেষ স্মৃতিচারণা করে শোকাচ্ছন্ন বাবা আব্দুল মোতালিব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ঘটনার দিন ৩০ আগস্ট রাত ১১টার দিকে ছেলের সাথে আমার শেষ কথা হয়েছিল। সে জানিয়েছিল, সামনের ঈদ আমাদের সাথে বাড়িতে করবে। মায়ের সাথেও কথা বলেছিল। আধা ঘণ্টা ডিউটি বাকি আছে জানিয়ে সে বলেছিল ডিউটি শেষ করেই আবার ফোন দেবে। কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি, এল আমার ছেলের নিথর দেহ।”
সকালে মরদেহ কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তরগাঁও গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরে উত্তরগাঁও উত্তরপাড়া জামে মসজিদে বাদ জুমা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। প্রবাসে মর্মান্তিক এই মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবার ও পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর