প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশ্বাসের পর দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস প্রবাহও বেড়েছে। তবে শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, সরবরাহ বাড়লেও অনেক শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে না পৌঁছানোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আর বিদ্যুৎ ঘাটতিও রয়ে গেছে আগের মতোই।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত ৮টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ৬০৯ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ১ হাজার ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এটি সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ সরবরাহের একটি রেকর্ড। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টায় মোট সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২১০ মিলিয়ন ঘনফুট। যার মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ৬১৭ মিলিয়ন ঘনফুট ও এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৯৯৩ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে দেশের দৈনিক চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হওয়ায় এখনো প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মাসে এরই মধ্যে চারটি এলএনজি কার্গো দেশে এসে পৌঁছেছে। ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও পাঁচটি কার্গো পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরজুড়ে বড় ধরনের সংকট না থাকার আশা করছে সরকার। সেইসঙ্গে অক্টোবর মাসের জন্যও এলএনজি কেনার কার্যক্রম চলছে।
তবে গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। গত মঙ্গলবার ১৭ হাজার ৪৮৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং করা হয় ১ হাজার ৩২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ঢাকায় ১৫২ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে ৩০ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ১১ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ৪৫৫ মেগাওয়াট, সিলেটে ১৮৯ মেগাওয়াট, খুলনায় ৯০ মেগাওয়াট, বরিশালে ৬ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ৩৯ মেগাওয়াট ও রংপুরে ১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। এ ছাড়া রাতের চাহিদা ও উৎপাদনের পূর্বাভাসেও প্রায় ১ হাজার ৩৬০ মেগাওয়াট ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। ফলে শিল্পকারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহও স্বাভাবিক হয়নি।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, মঙ্গলবার থেকে শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট থাকবে না। এরপরই সোমবার রাত ৯টার পর থেকে এলএনজি সরবরাহ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ওই সময় এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়, যা ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সর্বোচ্চ।
তবে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) করা এক সাম্প্রতিক জরিপে শিল্পে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। ১৩৪টি কারখানার তথ্যের ভিত্তিতে করা এ জরিপে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডাইং কারখানার উৎপাদন গড়ে ৫১ শতাংশ কমেছে। নিটিং উৎপাদন কমেছে ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ এবং তৈরি পোশাক সেলাই উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
জরিপ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানার উৎপাদন কমেছে। গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ কারখানা। যেসব প্রতিষ্ঠান গ্যাসের চাপের তথ্য দিয়েছে, তাদের স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় গড়ে ৭৮ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় আগের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে, অর্থাৎ অনেক এলাকায় লোডশেডিংয়ের সময় তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংকটের আর্থিক প্রভাবও বাড়ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে ৯২ শতাংশ কারখানাকে। প্রায় ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ৮৭ শতাংশের শিপমেন্ট বিলম্বিত হয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকে ক্রেতাদের মূল্য ছাড় দিতে হয়েছে। ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছে এবং ৫৫ শতাংশ কারখানায় রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরবরাহ বাড়লেও এখনো সব এলাকায় তার প্রভাব পৌঁছেনি। কোথাও ১৫ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে, আবার কোথাও এক বা দুই পিএসআই, এমনকি শূন্যও রয়েছে। চট্টগ্রামে তুলনামূলক ভালো চাপ মিলছে; কিন্তু ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হতে আরও সময় লাগবে।
অন্যদিকে, গ্যাস খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের ঘাটতির কারণে পুরো পাইপলাইন নেটওয়ার্কে গ্যাসের চাপ পুনরুদ্ধার হতে সময় লাগছে। সরবরাহ বাড়লেও গ্রাহক পর্যায়ে তা পৌঁছাতে এক থেকে দুদিন সময় লাগতে পারে। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। এসব এলাকার কিছু কারখানা ২০ থেকে ৩০ পিএসআই পর্যন্ত চাপ পাচ্ছে। তবে গাজীপুর ও সিলেট অঞ্চলে এখনো সংকট প্রকট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনে সাপ্তাহিক ছুটির সময় শিল্পকারখানার গ্যাস চাহিদা কমে গেলে পাইপলাইন নেটওয়ার্কে চাপ আরও স্থিতিশীল হতে পারে। তখন শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. শোয়েব বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ এরই মধ্যে বেড়েছে। তবে কিছু জায়গায় চাপ কম আছে। বিশেষ করে গাজীপুর, ময়মনসিংহ এলাকা মহেশখালী (এলএনজি টার্মিনাল) থেকে দূরে হওয়ায় চাপ বাড়তে কিছুটা সময় লাগছে। অন্যান্য শিল্প অঞ্চলে এ সমস্যাটা নেই। আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, দ্রুতই পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর