বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা পটুয়াখালীর কুয়াকাটার সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র চর বিজয় দ্বীপে দেখা মিলেছে দৃষ্টিনন্দন নীল-সবুজ রঙের পরিযায়ী পাখি ‘ভেরডিটার ফ্লাইক্যাচার’ (Eumyias thalassinus)। গত ৪ অক্টোবর দ্বীপটিতে পাখিটির দেখা মেলে।
স্থানীয় ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, নির্জন চর বিজয়ে নতুন এই পাখির উপস্থিতি দ্বীপটির ক্রমবর্ধমান জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সাধারণত ভেরডিটার ফ্লাইক্যাচারের দৈর্ঘ্য ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।
স্থানীয় জেলে সাইদুল জানান, চরের বালুর ওপর ভেজা অবস্থায় পাখিটিকে দেখতে পান তিনি। পরে সেটিকে উদ্ধার করে গঙ্গামতির বনে রোদে শুকিয়ে সুস্থ করার পর অবমুক্ত করা হয়। তিনি জানান, এমন নীল রঙের পাখি তিনি আগে কখনো দেখেননি।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, চর বিজয়ে পরিযায়ী পাখির নিয়মিত বিচরণ প্রমাণ করে দ্বীপটি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলে পরিণত হচ্ছে। ভেরডিটার ফ্লাইক্যাচারের মতো পাখির উপস্থিতি আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা দেয়। পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে শিকার ও জাল পাতা বন্ধের পাশাপাশি পর্যটকদের সচেতন হতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে বনায়ন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বন বিভাগের ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ: বার্ডস’ অনুযায়ী, ভেরডিটার ফ্লাইক্যাচার বাংলাদেশে সাধারণ ও বিস্তৃত শীতকালীন পরিযায়ী পাখি। শীতকালে একা বা ছোট দলে বিচরণ করা এ পাখি খোলা বন, বনপ্রান্ত, ঝোপঝাড় ও গ্রামীণ গাছপালার এলাকায় দেখা যায়। ছোট ছোট পোকামাকড় এদের প্রধান খাবার। বিশ্বব্যাপী প্রজাতিটি ‘লিস্ট কনসার্ন’ (LC) শ্রেণিভুক্ত।
বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, চর বিজয়ে ঝাউ, হেঁতাল, গেওয়া ও গোলপাতাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে এবং নিয়মিত বনায়ন কার্যক্রম চলছে। প্রায় ২৩০ একর আয়তনের এ চরে সারা বছর বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ দেখা যায়। শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিথি পাখির পাশাপাশি গাংচিল, বদর কবুতরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আসে। এছাড়া বক, সাদাবক, গোবক ও চ্যাঁকাসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ প্রজাতির পাখির বিচরণ রয়েছে। দ্বীপজুড়ে রয়েছে লাল কাঁকড়ার বিচরণ।
তিনি আরও বলেন, চর বিজয়ের চারপাশে পানির গভীরতা কম হওয়ায় এলাকাটি সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও পোনা বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে গড়ে উঠছে। তবে বন বিভাগের লোকবল ও নৌযানের সীমাবদ্ধতার কারণে দ্বীপটিতে নিয়মিত নজরদারি কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত সহায়তা পাওয়া গেলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
পাখি পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশে শীতের অতিথি পাখিদের আগমন শরতের শেষভাগ থেকেই শুরু হয়। ভেরডিটার ফ্লাইক্যাচারকেও শীতকালীন পাখি হিসেবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়। গবেষণায় বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর মাসেও এ প্রজাতির উপস্থিতির রেকর্ড রয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, শীত মৌসুমের শুরুতেই চর বিজয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে। দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চর বিজয় শীত মৌসুমে পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম বিচরণস্থল হিসেবে পরিচিত। বন বিভাগের উদ্যোগে দ্বীপটিতে ঝাউসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে। ২০২৫ সালে চর বিজয়ে ৪০ হাজার ঝাউগাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক বনায়নের ফলে ভবিষ্যতে চর বিজয় অতিথি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে বলে আশা করছে বন বিভাগ।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর