আমিরুল ইসলাম: রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। বেপরোয়া চলাচল, ট্রাফিক আইন না মানা, যেখানে-সেখানে মোড় নেওয়া, প্রধান সড়কে উঠে পড়া এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে নগরবাসীর একটি অংশের কাছে এই যান এখন বিরক্তির কারণ। অথচ এত অভিযোগের পরও সরকার অটোরিকশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটছে না। বরং নীতিমালার আওতায় এনে নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
এর মধ্যেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে অটোরিকশাচালকদের সাম্প্রতিক আন্দোলন। রাজধানীতে হাজারো চালকের সড়ক অবরোধ, ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম এবং আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারির পর প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে—জনগণের অসন্তোষ থাকার পরও সরকার কেন অটোরিকশার প্রতি নমনীয়?
রাজপথে হাজারো চালক
গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার হাজারো চালক। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করলে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আশপাশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জব্দ ও ডাম্পিং করা হচ্ছে, চালকদের জরিমানা করা হচ্ছে এবং চার্জিং গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে অটোরিকশার রোড পারমিট দেওয়া, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা, চার্জিং গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ সচল রাখা এবং জব্দ ও হয়রানি বন্ধ করা।
পরে আন্দোলনকারীরা সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিষয়টি এখন শুধু পরিবহন ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একই সঙ্গে শ্রমিক, জীবিকা এবং রাজপথের আন্দোলনের ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
আন্দোলনের পরদিন সরকারের বার্তা
ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সময়।
৫ অক্টোবর অটোরিকশাচালকদের বড় ধরনের আন্দোলন ও আলটিমেটামের পরদিন ৬ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে আবারও জানানো হয়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ চলছে।
সড়ক, রেলপথ ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এসব যান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে আন্দোলনের কারণেই সরকার এমন অবস্থান নিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ অটোরিকশাকে নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ আগে থেকেই চলছিল। কিন্তু হাজারো চালকের রাজপথে নেমে আসা এবং কঠোর কর্মসূচির হুমকি সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করা কঠিন।
মানুষ বিরক্ত, আবার মানুষই যাত্রী
অটোরিকশা নিয়ে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই।
রাজধানীর অনেক বাসিন্দা প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ে বিরক্ত। বিশেষ করে প্রশিক্ষণহীন চালক, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, উল্টো পথে চলা, ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
কিন্তু যে মানুষ অটোরিকশার কারণে যানজটে বিরক্ত হচ্ছেন, প্রয়োজনের সময় তিনিই আবার এই যানের যাত্রী হচ্ছেন।
অলিগলি, আবাসিক এলাকা কিংবা বাসা থেকে বাসস্ট্যান্ড, বাজার বা মেট্রোরেল স্টেশন পর্যন্ত স্বল্প দূরত্বে অটোরিকশা এখন গুরুত্বপূর্ণ বাহন। যেখানে বাস বা অন্য গণপরিবহন সহজে পৌঁছায় না, সেখানে এর বিকল্পও সীমিত।
ফলে সাধারণ মানুষের অবস্থানও একেবারে সাদা-কালো নয়। আপত্তি মূলত অটোরিকশার অস্তিত্বের চেয়ে এর অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও সড়কে বিশৃঙ্খলা নিয়ে বেশি।
কঠোর হতে গেলে সামনে জীবিকার প্রশ্ন
সরকারের নমনীয়তার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত জীবন-জীবিকার বাস্তবতা।
অটোরিকশার স্টিয়ারিং ধরে শুধু একজন চালকের সংসার চলে না। এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে বড় একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। মালিক, গ্যারেজ ব্যবসায়ী, মেকানিক, ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ বিক্রেতা, চার্জিং ব্যবসায়ীসহ বহু মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
ফলে সরকার যদি একদিনের সিদ্ধান্তে এসব যান বন্ধ করে দেয়, তার প্রভাব শুধু সড়কে পড়বে না; বিপুলসংখ্যক পরিবারের আয়ের ওপরও পড়বে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনেও জীবিকার প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। চালকদের বক্তব্য—অটোরিকশা বন্ধ করতে হলে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে হবে।
এখানেই সরকারের জন্য সিদ্ধান্তটি কঠিন।
আছে আন্দোলনের চাপও
অটোরিকশাচালকদের সাম্প্রতিক কর্মসূচি আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—এই খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা এখন সংগঠিত।
তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কয়েক হাজার মানুষ নিয়ে কর্মসূচি পালন করতে পারেন। সড়ক অবরোধ করতে পারেন। সরকারের কাছে আলটিমেটাম দিতে পারেন এবং আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিতে পারেন।
সরকার হঠাৎ কঠোর অবস্থানে গেলে তাই শুধু অটোরিকশা বন্ধ করলেই বিষয়টির সমাধান হবে না; নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ও রাজপথের অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কাও থাকবে।
ফলে প্রশাসনের সামনে হিসাবটি জটিল—অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে করতে হবে যাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমে না আসে।
বিকল্প পরিবহনই বা কোথায়?
অটোরিকশা বন্ধের দাবির বিপরীতে আরও একটি বাস্তব প্রশ্ন রয়েছে—এর বিকল্প কী?
ঢাকার সব এলাকায় বাস যায় না। মেট্রোরেলও প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় পৌঁছায় না। অনেক এলাকায় প্রধান সড়ক থেকে বাসাবাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য রিকশা বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাই সবচেয়ে সহজ বাহন।
অটোরিকশা রাতারাতি তুলে দেওয়া হলে সেই যাত্রীরা কোথায় যাবেন—সরকারকে সেটিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
তাই অটোরিকশাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে নির্ধারিত এলাকা ও রুটে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার ধারণাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকার আসলে উভয় সংকটে
একদিকে রাজধানীর যানজট, সড়ক নিরাপত্তা এবং নগরবাসীর ক্ষোভ। অন্যদিকে স্বল্প দূরত্বে সাশ্রয়ী পরিবহনের প্রয়োজন, বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা এবং সংগঠিত চালকদের আন্দোলনের চাপ।
এই তিন বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে সরকার।
কঠোরভাবে বন্ধ করলে কর্মসংস্থান ও পরিবহনে সংকট তৈরি হতে পারে। আবার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া চলতে দিলে রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে পারে।
এ কারণেই সম্ভবত সরকারের বক্তব্যে ‘নিষিদ্ধ’ করার চেয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ’, ‘নীতিমালা’, ‘নিবন্ধন’ ও ‘নির্ধারিত রুট’—এই শব্দগুলো বেশি শোনা যাচ্ছে।
নমনীয়তা নাকি বাস্তবতার স্বীকৃতি?
তাহলে অটোরিকশার প্রতি সরকারের অবস্থানকে কি শুধুই নমনীয়তা বলা যাবে?
বাস্তবে এটি হতে পারে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার সমন্বিত হিসাব। কারণ একটি যান যখন লাখো মানুষের জীবিকার উৎস এবং একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে যায়, তখন শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে সেটি তুলে দেওয়া সহজ নয়।
কিন্তু এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আন্দোলনের চাপ কিংবা জীবিকার যুক্তিতে যদি অটোরিকশাকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে দেওয়া হয়, তাহলে তার মূল্য দিতে হবে সাধারণ নগরবাসীকে। আবার বিকল্প ব্যবস্থা না করে কঠোরভাবে বন্ধ করলে তার মূল্য দেবেন চালক ও যাত্রীরা।
তাই সমাধান নিষেধাজ্ঞা কিংবা অবাধ চলাচল—কোনোটিই নয়। প্রয়োজন বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, দৃশ্যমান নম্বর প্লেট, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, নির্ধারিত গতিসীমা, মানসম্মত যান, নির্দিষ্ট রুট এবং প্রধান সড়কে চলাচলের বিধিনিষেধের কঠোর বাস্তবায়ন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি অটোরিকশা থাকবে কি থাকবে না—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, জনগণের ভোগান্তি কমিয়ে এবং জীবিকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই বিশাল খাতকে আদৌ শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে পারবে কি না।
সর্বশেষ খবর